পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

চেনা গান, অচেনা গীতিকার-৫ : সজল কান্তি সরকার

Reading time 14 minute
5
(25)

কত কষ্ট করে কৃষক ফসলও ফলায়
চৈত্রমাসে নিল ফসল প্রবলও বৈন্যায়।

২০১৭ সালে চৈত্র মাসের শুরুতেই আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের সমস্ত ফসলি জমি তলিয়ে যায়। অসহায় কৃষককুল তার তলিয়ে যাওয়া জমি দেখতে গিয়ে সারি গান গেয়ে গেয়ে মনের আকুতি প্রকাশ করে। আবেগ অনুভূতি প্রকাশের সুরেলা মাধ্যমই যেন হাওরবাসীর সহজাত প্রবৃত্তি। সুসময়ে কিংবা নিদানে, আপস কিংবা সংগ্রামে, জয়ে কিংবা পরাজয়ে, চরমে কিংবা পরমে মনের কথা প্রকাশ করতে সুর যেন সদা জাগ্রত। স্বজন হারিয়ে কিংবা অতি দুঃখে হাওরবাসীর কণ্ঠে বিলাপ-সংগীত আমি অনেক শুনেছি; কিন্তু বৈঠার তালে নৌকা বেয়ে ডুবে যাওয়া জমি দেখতে দেখতে ফসলহারা কৃষকের কণ্ঠে ‘বিপর্যয় সংগীত’ যেন টাইটানিক ডুবে যাওয়া যাত্রীদের শান্ত রাখার দায়কেও হার মানিয়েছে। শুধু তাই নয়, তেমনটি হাওরের নিদানকালে মাটির উঠানে ধামাইল গানের আসরে কৃষাণীর কণ্ঠেও গাইতে শোনা যায় ধামাইল :

শুনরে কৃষক ভাই জলদি করে আয়
হাওরে দেখা দিলরে অকাল বন্যায়,
ভাই মায়ে ডাকাডাকি চল গিয়ে মাটি কাটি
উড়া কোদাল নিয়ে চলো জাঙ্গালেতে যা-ই।
মোরা মাটি কাটায় যাই
উত্তরেতে সাজ করে ঘনঘন বজ্র পড়ে
মায়ের মনে ধড়ফড় করে এখন কোথায় যাই।২
এরিমধ্যে বর্ষণ নামলো জাঙ্গাল ভেঙে হাওর ডুবলো
সকল ফসল নষ্ট হলো কৃষক নিরুপায়।
মোদের কৃষক নিরুপায় ভাইরে কৃষক নিরুপায়
ভেবে দীপা সরকার বলে
হাওরে বেড়িবাঁধ হলে সকল দুঃখ যাবে চলে।
কৃষক খুশি ভাই
মোদের কৃষক খুশি ভাই।

Flood and Resisitence; Haor Bangla 2017; Source: Jangaler Golpo: A Dcoumentary Clip; @thirdlanespace YTC

নিকট অতীতে হাওরাঞ্চলে ফসলের এমন বিপর্যয় কখনও হয়নি। পাহাড়ি ঢলে হাওরের সমস্ত জমি তলিয়ে যায়। ভাটি-ময়ালে চরম অভাব দেখা দেয়। ময়ালে বিকল্প আয়-রুজির কোনো ব্যবস্থা নেই। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ত্রাণ পাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকে। বাঁচার লড়াই চলছে। এ-অবস্থায় তথ্য অনুসন্ধানে গীত-গান নিয়ে কারও সাথে আলাপ করার সুযোগ নেই। দিকে গীতের ‘লীলাবালি’ নামক মায়ামৃগ আমার সাথে ‘আলীবালি’ শুরু করছে; তাকে না ধরা পর্যন্ত অন্য কোনো কাজে কিছুতেই মন বসছে না। কী করি! কোথায় যাই! এমন অস্থিরতা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে; কিন্তু হাওরবাসীর বাঁচার পরিবেশ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে :

ত্রাণ চাই, ত্রাণ চাই
ত্রাণ ছাড়া গতি নাই

হাওরে গীতের গলা এখন ত্রাণের থালা। এমন নিদানকালে তাই ঘরে বসে না থেকে আমিও যাই ত্রাণ বিতরণ করতে। প্রবাসী বন্ধু কেশব লোধের সহযোগিতায় প্রায় শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাতাকলম বিতরণ করি। অবশ্য এ-নিয়ে কেউ-কেউ উপহাস করে বলেছেন :

পেটে নাই ভাত,
বেরাশে মাঝে দাঁত।

যাইহোক, মূলত যে-জন্য কাজটি করেছি তা হলো, হাওরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার অভ্যাস ধরে রাখা; যেন পাঠদান ব্যাহত না হয় ও তারা ঝরে না পড়ে অকালে। অভাব একদিন কেটে যাবে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা অনেক কঠিন হবে সামনে। আমার বন্ধুও এই ব্যাপারে একমত সেখানে। বিমান তালুকদার, অসীম সরকার, সুমন সরকার, নিখিলেশ সরকার, পরেশ সরকার, উত্তম কাব্য, কাঞ্চন রায়, বিকাশ পাল, আরিফ, সুমন সরকার ও সাংবাদিক বাদল দাসসহ একটি টিম নিয়ে হাওরে নৌকা ভাসাই। এলাকার অনেকে শামিল ছিলেন; বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকগণের মধ্যে রজত তালুকদার ও পুরঞ্জয় সাহা রায় ছিলেন খুবই আন্তরিক। দিনের বেলা আমরা নৌকাযোগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে খাতাকলম বিতরণ করি। রাতে কৃষকদের নিয়ে গ্রামে-গ্রামে বাড়ির উঠোনে ‘হাওর বৈঠক’ করি। বৈঠকের মূল বিষয় ছিল :

ত্রাণ নয়,
অধিকার চাই।

ত্রাণ যেন দাসত্বের শিকল না পরায় পায়ে। অর্থাৎ, শিকল ছেঁড়ার লড়াই। হাওর বৈঠকে ময়ালের সচেতন মহলও আমাদের সাথে যোগ দেন। দাবি ওঠে ভাসা পানিতে মাছ ধরার অধিকার নিয়ে। এক বছরের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন মওকুফ, বিনামূল্যে সার ও কৃষিবীজ বিতরণ ইত্যাদি। দুঃখের বিষয় সরকারের বিশেষ কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সবটাই যেন ত্রাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ত্রাণের নামে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে মোড়লিপণা। কর্পোরেট পুঁজির অনুপ্রবেশ। বর্গী আসে, আর ভেঙে পড়তে থাকে সহজ গৃহস্থালি প্রথা ও স্বাধীন কৃষিব্যবস্থা। বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষি মৌসুমে প্রায় বারোহাজার কৃষকের মাঝে আমরা শস্যবীজ বিতরণ করি।

Flood 2017 in Haor Region; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

কাজের সুবাদে তখন দীর্ঘসময় হাওরের গ্রামে গ্রামে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল। আমার বাড়ি যদিও হাওরে, তবু নিদানকালের অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। কাজের ফাঁকে-ফাঁকে রাতে গানের আসর বসে। চলে লীলাবালির খোঁজ। হাওরের ফসলহানির সময়কালীন চিত্র ধারণ করে ‘জাঙালের গল্প’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করে হাওর বৈঠকের শুরুতে দেখানোর ব্যবস্থা করি। আয়োজন করি আনন্দগানের। তখন যে-বিষয়টি বিশেষভাবে আমার নজরে আসে তা হলো সমাজব্যবস্থা ও মনোজগতের সূক্ষ্ম পরিবর্তন। অভাবের কারণে হাওরবাসীর স্বভাব ও ভাষাগত পরিবর্তন। সাংস্কৃতিক ও ভাবগত পরিবর্তন, যা রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা দাতাগোষ্ঠীর কল্যাণে ইতোপূর্বে কখনও ঘটেনি। এ-যেন…

অভাবে স্বভাব নষ্ট,
স্বভাবে সমাজ নষ্ট
সমাজ দোষে রাউ,
রাউ দোষে মন নষ্ট
মন দোষে ভাব নষ্ট
নষ্ট কোলের ছাউ।

ত্রাণের উসিলায় চারিদিকে হাওরবিলাসিতার ডামাডোল বাজে। ত্রাণকে কেন্দ্র করে পর্যটন-আনন্দ মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ত্রাণদাতাদের দানের চেয়ে পাওয়ার আকাঙক্ষা সেখানে বড়ো। গানের বিলাসী আসর বসানো হয় পয়সার বিনিময়ে। গানের উন্মুক্ত গলা বিক্রির হিড়িক পড়ে। নানারকম কর্পোরেট বাদ্যযন্ত্রের ভিড়ে মাটির আসরে লাউ-ডপকি-সরাজ-খমক-খোল-করতাল ও হাততালি দিয়ে গানের কদর আসে কমে। ভাটির গীত-গানের ভাবজগতে মরিচা ধরা শুরু হয়। হালের গান, পালের গান, টহলের গান, বাউল গান, সারি গান, জারি গান, নাউ দৌড়ানির গান, মাঝির গান, বিয়ের গান, ধামাইল গান, মেয়েলি গীত, পুথি, পুরাণ, পাঁচালি, ভাট কবিতা, মাগন গান, পালা গান, সন্ন্যাস গান, গাজী-কালুর গান, ফকিরি গান, মুর্শিদী গান, কিচ্ছা-পালা গান, বানেছার গান, ঊড়ি গান, লুট-কীর্তন, ঘাটের গান, পথের গানসহ ঘুমপাড়ানি মায়ের গান পর্যন্ত ত্রাণদাতাদের মনোরঞ্জনে টাকার বিনিময়ে সত্তা হারিয়ে ব্যবহৃত হয়ে চলে। গায়কের মনের খাতায় লেখা গান কাগজের খাতায় বাজারের ফর্দ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয় গায়ইয়াগণ সহজীয়া ভাব ছেড়ে রক্ষণশীল হয়ে পড়েন।

কান পাতলে এখন আর আগের মতো মন-উদাস দরদি গান যত্রতত্র হাওরে শোনা যায় না। বিকট আওয়াজে সাউন্ডবক্সের ভিতর থেকে কেবল বাজনা কানে আসে। ভাটির পথঘাটে সবুজ ঘাসের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকা আদরের গানগুলো কুড়িয়ে নিয়ে টোকাইরা বক্সগানের দোকান খুলে বসেছে! খুচরা বা পাইকারি দরে যা বিক্রয় হয় এখন। গান মাগনা শোনার দিন শেষ। পর্যটনের নৌকায় ধামাইল আসর বসে টাকার বিনিময়ে রাতচুক্তি। ‘মুখ্যাদ্যিয়া’ গীতনিবৈইনাইনগণও এখন আর ঘরে বসে নেই। কেউ কেউ গিরস্তালি বেঁচে দিয়ে ‘পর্যটন বোট’ বানিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। সুবল কীর্তনিয়া মৃদঙ্গ ছেড়ে পর্যটন-তরিতে মাঝি হিসেবে বৈঠা ধরেছে। বক্সগানের বিকট আওয়াজে তার মৃদঙ্গের মিষ্টি বোল চাপা পড়ে গেছে। সাতহাল জমির বড়ো গিরস্ত এখন সাতটি পর্যটন-তরির মালিক। ছেলেমেয়ে নিয়ে পর্যটন প্যাকেজের পরিকল্পনায় ব্যস্ত। গল্প বলা অলস বৃদ্ধ দাদু পর্যটন ময়ালে পানের দোকানদার। বাহারি পান সাজানোর পরিকল্পনায় ব্যস্ত।

Haor: The beauty of waterland; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

পুথিগায়ক সিরাজ ভাই ‘পর্যটন বোটের’ পাঁচক এখন! মোবাইলে রান্নার রেসিপি জানতে জানতে ভুলে গেছে পুথির সুর। মধ্যনগর বাজারের মাছ মহালে ২০১৭-য় তাঁর সাথে দেখা! পঞ্চাশজন পর্যটকের রান্নাবান্নার সওদাপাতি নিয়ে ব্যস্ত। পুথিপাঠের টানে রাত কাটানো অথবা টং-দোকানে বসে আমার সাথে ভাবের রং-চা খাওয়ার সময় তার নেই। মুখের হাসি অবশ্য এখনও অমলিন। সেদিন চোখ আর হাত ইশারায় সিরাজ ভাই আমাকে যা বলেছিল তার থেকে বুঝতে পেরেছিলাম এটুকুই : ‘ভাইয়ু আমি ভালা আছি, পরে দেখা অইব।’

পুথিগায়ক সিরাজ ভাইয়ের সাথে হয়তো এ-দেখা শেষ দেখা! আবার দেখা হলে তা হয়তো হবে অন্যরূপে বা অন্য ভাবাবেশে। অলস বর্ষায় কিংবা চৈতের অবসরে তার সুললিত কণ্ঠে হয়তো আর কখনো শোনা হবে না পুথির সুরেলা বয়ান :

আল্লার নাম লইলাম নারে দিলে গোলমাল করে…(দিশা)।
ইলাহি আলমিন আল্লা পাক পরওয়ার,
তুমি-তো মাবুদ আমি বান্দা-যে তোমার

যাত্রা অভিনেতা বরুণ কাকা’র এখন আর তেমন কদর নেই। সিরাজ ভাইয়ের মতো তিনি রাঁধতে পারেন না। গায়েগতরে শক্তিও নেই। তাছাড়া পর্যটনের নৌকায় তো আর যাত্রামঞ্চ হয় না। বিক্রি হয় না যাত্রার ডায়ালগ। আক্ষেপ করে বলছিলেন : ‘সময় কাটে না, সবাই এখন ব্যস্ত। ভাবতেছি একটা দোকান দেব!’

দোকানে বসে ব্যবসার লাভ-লোকসান হিসাব করতে-করতে বরুণ কাকার কি মনে পড়বে রঞ্জন দেবনাথ রচিত ‘একটি পয়সা দাও’ যাত্রা-পালার শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্যে অসহায়দের বাঁচাতে জগা চরিত্রের সেই বিখ্যাত ডায়ালাগ :

দীপ নিভে গেল! ওগো দেশবাসী চেয়ে দেখো, দীপ নিভে গেল; এভাবে হাজার হাজার রুনু (বরুণ) অভাবের জ্বালায় অকালে নিভে যাচ্ছে। এদের তোমরা বাঁচাও;—একটি পয়সা দাও, ওদের বাঁচাবার জন্য তোমরা সামর্থ্য অনুসারে একটি পয়সা দাও;—শুধু একটি পয়সা দাও।

দোকানে বসে বরুণ কাকা হয়তো যাত্রার ডায়ালগ দিবেন না। হয়তোবা তেলে জল, চালে কাঁকর মিশিয়ে অধিক লাভের আশায় দোকান নিয়েই মগ্ন থাকবেন। কারণ জীবন তো আর যাত্রামঞ্চ নয়!—যেখানে রুনুর পাশে এসে দাঁড়াবে জগা। যাত্রাশিল্পের করুণ দশা! এক সময়ের নায়ক চরিত্রের স্বনামধন্য যাত্রা-অভিনেতা তারা মিয়া কাকা আক্ষেপ করে বলেছেন :

বাবারে যে-যুগ আইছে, যাত্রা-টাত্রা আর অইত না! রাইত জাগিয়া রিয়ার্সেল দিয়া নিজের গাইডের (*গাঁট/গাঁইট) টেকা খরচ কইরা, কার ঠেকা লাগছে যাত্রা করত? সবেই এখন নিজের ধান্ধায় ব্যস্ত। এখন আর আগের মত সখিনদার মানুষ নাই।

সে যাইহোক, যাত্রা-শিল্পীদের এমন করুণ দশা হলেও ভাটি গাঁয়ের সহজ-সরলা ধামাইল শিল্পীদের ‘ফোন বিজি’ থাকে। সামাজিক অনুষ্ঠানে উঠান-আসরের প্রয়োজনে তাদের নাগাল সহজে পাওয়া যায় না। এদিকে গীতের মা-খুড়িগণ পালাবদলের হাওয়ায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গীতের সুর-তাল-লয় তুলে দিতে পারছেন না। গাইতে পারছেন না ‘মুখ্যাদ্যিয়া’ দিশার সুর কিংবা জীবনঘনিষ্ঠ মহলার লাচারি। এই আক্ষেপ ঝরে সৌদামীনি দাসের কণ্ঠে :

যুগের যে-বাও ধরছে, খালি গলার গীত আর কেউ হুনত না; অখন গানের কথা, তাল, লয়, আর সুরের মান নাই। খালি আউলা-ঝাউলা তাল আর ফাল :

গানের চে বাজনা বেশি,
ভাবের চে ভঙ্গি বেশি।

সৌদামীনি দাসের কথাই সত্যি। তাঁর এই কথায় সুর মিলিয়েছেন নিত্যগোপাল সরকার। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হাওর-বৈঠকে। একজন ভালো গায়ক। বিশেষ করে কীর্তন গাইতে বেশ পারদর্শী। ভাবজগতের মানুষ। গুরুবাদে বিশ্বাসী। গীত-গান নিয়ে বেশ জানাশোনা আছে। শুদ্ধ সুর-সংগীতের ব্যপারেও সচেতন। বেসুর সময়ে যেন সুরের ভিখারী।

Haor: The watery landscape; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে জীবন চালালেও সংগীত নিয়ে আলাপচারিতায় হয়ে ওঠেন কবিরত্ন পণ্ডিত কালিদাসের পরম্পরা।মনপ্রাণ উজাড় করে কথা বলতে গিয়ে মুখের কথায় সাধুভাষার প্রলেপ ও শুদ্ধতায় তাঁর দেহভঙ্গিতে আসে তেজ। মলিন বস্ত্র আর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা বিবর্ণ মানুষটি নিমিষে হয়ে ওঠেন পণ্ডিত সুরের মহাজন। এ-যেন ‘লুকাইত’ (*লুক্কায়িত) লোকায়ত অমূল্য সম্পদ। একদিন হাওর-বৈঠক শেষে গীত নিয়ে আলাপচারিতায় নিত্যগোপাল সরকার বলেন : ‘গীত আর ‘নৃত’, মানবদেহে স্থাপিত।’

এ-কথা শোনার পর আমি আর কথা বাড়াইনি। তাঁর এহেন ভারী কথা শুনে আমার মনে হলো লীলাবালির ব্যপারে তাঁর নিকট থেকে একটা ফয়সালা আসতে পারে। সময় ঠিক করে চলে যাই তাঁর বাড়িতে। ভণিতা ও আনুষ্ঠানিকতা তিনি পছন্দ করেন না। আমিও তাই আলাদা সৌজন্য বাদ দিয়ে স্বাভাবিক আলাপে প্রবেশ করি। একপর্যায়ে প্রশ্ন করি তাঁকে : ‘দাদা, গতকাল আপনি বলেছিলেন, গীত আর ‘নৃত’ মানবদেহে স্থাপিত। এখানে ‘নৃত’টা কী?’

তিনি মাথা নত করে মাটির দিকে তাকিয়ে ভাবতে-ভাবতে উত্তর দেন : ‘এ-তোমার বড্ডো অনুসন্ধিৎসু জিজ্ঞাসা! কিন্তু এ-উক্তি আমার নহে। কিংবদন্তি। অর্থাৎ, ‘নৃত’ হতে নৃত্য। যা কিনা গীত-তাল-লয় সম্যক ক্রিয়ার ফল। মানবদেহে যার আসন।’

তাঁর কথার গভীরে পৌঁছাতে গিয়ে আমি আমার কথার স্বাভাবিক খেই হারিয়ে ফেলি। মনে হচ্ছিল এতো জটিল কথাবার্তার দরকার নেই। আপাতত এখানে ইতি টানি বরং, কিন্তু তা আর হলো না! গীত ও লীলাবালি প্রসঙ্গ চলে আসে আলাপে। তিনি বলতে থাকেন : ‘গীত হচ্ছে সুর-শশী। আঁধার বিনাশী। সর্বত্র সুরসী, সর্বজন প্রেয়সী। যেখানে ‘নৃত’ যোগ হলে জাগে ব্রহ্মাণ্ড।’

Sona Bandhu re, Nirole Tumare Pilam Na by Radharaman; Group Rehearsel: Koli Dhamail Group; Spot: Kathir, Sunamganj; Source: Third Lane Space YTC

কথা শেষ হতে-না-হতে বৌদি অতিথি আপ্যায়নে চা নিয়ে ঘরে ঢোকেন। দাদা চা হাতে নিয়ে আমাকে উদ্দেশ করে তখন বলে চলেছেন : ‘এই-যে চা পান করতে গিয়ে আমরা উষ্ণতা অনুভবের জন্য প্রস্তুত হবো, ঠোঁট-জিহবা ও মুখগহ্বর সেই অনুযায়ী ক্রিয়া করবে, ঠিক তেমনি গীত পরিবেশনের সময় দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্রিয়াশীল হয়। যাহা ‘নৃত’; আর তার পূর্ণ রূপ হলো নৃত্যকলা।’

চা পান করতে গিয়ে কথায় ক্ষণিক বিরতি আসে। তিনি হুক্কায় তামাক সাজিয়ে টানতে-টানতে তৃপ্ত হয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন : ‘বৈদিক যুগের স্তোত্র বা স্তব থেকেই গীতধারার সূত্রপাত বলে গুণী-মহাজনগণ বলেছেন। যা কিনা শ্রবণযোগ্য সুরধ্বনি কাব্যধারা। প্রথমত, চর্যাপদ পরবর্তী বৈষ্ণবপদাবলী গীতনির্ভর বাংলা নিদর্শন বলে জ্ঞাত আছি।’

যতই কথা বাড়ছে, মনে হচ্ছে আমি যেন তাঁর তাত্ত্বিক আলোচনাকে মাঝে-মাঝে আবোলতাবোল প্রশ্নে বিব্রত করছি। প্রশ্নে না গিয়ে কোনো একটি বিষয় তাই ধরিয়ে দিতে থাকি। তিনি বলতে থাকেন। ভাটির গীত প্রসঙ্গে যেমন বলছিলেন : ‘ভাটির কৃষিসমাজ লোকগীতের উর্বর মেদিনী। নারীকুল তার জননী। মুখে-মুখে বান্ধে, সুরে-সুরে গায়। তাঁদের মাধ্যমেই গীতের ধরণ ও বিশেষণ বদলায়।’ তিনি যখন যে-বিষয়ে কথা বলেন, বলার সময়ে এমন আত্মমগ্ন থাকেন,—ভিন্ন প্রসঙ্গ তোলার সুযোগ থাকে না। আমি তবু একফাঁকে ‘লীলাবালি’র আলাপ তুলতে তিনি বলতে থাকেন :

গ্রামীণ লোকগীতে রাধাই লীলাবালি। লীলাবালি হলো অকুমারী রাধা। লীলা অর্থ লাবণী। তার সহযোগে বালী/আবালী অর্থ অকুমারী বা বালিকা বা কন্যাশিশু। আবার এই রাধাই বৃন্দাবনে প্রেমলীলায় কখনও প্রেমবালা, রসবতী, বিনোদিনী, কমলিনী ইত্যাদি। কখনও লীলাবতী রূপে মর্ত্যে গঙ্গা। ভগবতী রূপে পাতালের গঙ্গা। অর্থাৎ রাধা হলো নারীরূপের ক্রমবিকাশ। বিশেষণ। লোকসাহিত্যে বিশেষণে বিশেষায়িত করা… এটাই সৌন্দর্য। গীতে এই সৌন্দর্যের মহিমা অপার!

Lilabali Lilabali; Artist: Utpalendu Chowdhury; Source: Utpalendu Chowdhury Topic YTC

তাঁর কথার প্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও খোলাসা করতে প্রশ্ন করি : ‘তাহলে কি আমরা বলতে পারি রাধাই লীলাবালি?’ প্রশ্নের উত্তরে তিনি ব্যখ্যা দিলেন এভাবে : ‘হ্যাঁ, তবে শুধু রাধা কেন? প্রতিটি বালিকাই লীলাবালি। রতিক্রিয়া পর্বে একটি উক্তি আছে : ‘সুরত-কেলি যোগ্য নহে লীলাবালি।’ বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে আমি প্রশ্ন করি : ‘তাহলে কী ‘লীলাবালি লীলাবালি…’ গীতটি বালিকা রাধার রূপকে নিয়ে রচিত হয়েছিল?’ তিনি খুব রাশভারী স্বরে উত্তর দিলেন :

বর্তমানে যে-গীত আমরা শুনি বা শুনছি তাতে বাল্যবিবাহের যাতনা আছে। তখন তো ঋতুবতী হওয়ার পূর্বেই কন্যাদানের বিধান ছিল। আট বছর বয়সে। গৌরী বিবাহ। অর্থাৎ বিয়ের কন্যা মানেই লীলাবালি। নাবালিকা। তাই আমি মনে করি, একজন নাবালিকাকে ‘বর যোগ্য’ বা ‘বর যুবতী’ হিসেবে সাজানোর আক্ষেপানন্দ এই (লীলাবালি) গীতে রয়েছে। বাল্যকালে ‘বর যুবতী’ হওয়ার যাতনা থেকেই গ্রামীণ নারীসমাজ এই গীত রচনা করেছেন। পুরুষ সমাজ তো নারীর সকল যাতনা বুঝে না। তাইতো নারী আক্ষেপানুরাগে আরও কতশত গীত বা গান রচনা করেছেন। যেমন :

বনমালী (গো) তুমি পরজনমে হইও রাধা
আমি মরিয়া হইবো শ্রীনন্দের নন্দন
তোমারে বানাবো আধা।

তুমি আমারই মতন জ্বলিও জ্বলিও
বিরহ কৃষ্ণ নাম গলেতে পরিও
তুমি যাইও যমুনার ঘাটে
না মানি ননদিরও বাধা।

তুমি আমারই মতন কান্দিয়া কান্দিও
কৃষ্ণ কৃষ্ণ নাম বদনে জপিও
তুমি বুঝবে তখন নারীর বেদন
রাধার প্রাণে কত ব্যথা।’

তিনি গানটি আমাকে সুরে সুরেই শোনান। খুব মিষ্টি তাঁর গানের কণ্ঠ। গানটি শোনার পর আমি প্রশ্ন করি : ‘দাদা এই গানটি কার লেখা?’ তিনি কিছু সময় নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গিয়ে তারপর উত্তর করেন :

জানা নেই, তবে অনেক পদকর্তার নাম শুনি। দীন শরৎ কিংবা রাধারমণ;—তাঁদের নামও শুনি। এই গানে নারীর যাতনা প্রকাশ পেয়েছে। যেমন : …‘তুমি বুঝবে তখন নারীর বেদন রাধার প্রাণে কত ব্যথা…’ এই আবেগ কেবল নারীই প্রকাশ করতে পারে বলে আমি যুক্তিযুক্ত মনে করি। তাই এমনও হতে পারে অবলা নারীই এর রচয়িতা? তাছাড়া দীন শরৎ কিংবা রাধারমণের গান তো ভণিতাযুক্ত থাকে। এই গানে তো ভণিতা নেই।

তিনি খুব জোর দিয়েই বলছিলেন,—গানটির রচয়িতা অচেনা। বিষয়টি আমি তাঁকে খোলাসা করতে বলি : ‘তাহলে কী এ গানের গীতিকার অচেনা বলে আমরা ধরে নেবো?’ নিত্যগোপাল সরকার মাথা উঁচিয়ে উত্তর দিলেন : ‘কেন নয়?’

লীলাবালি গীত প্রসঙ্গেও তিনি একই মত দিয়েছিলেন সেদিন। শুধু তাই নয়, লীলাবালি গীতের আদি অস্তিত্বের কথাও বললেন। জোর দিয়ে বললেন,—গীত মুখে-মুখে যতদিন ছিল ততদিন সমাজ-জাত-পাত ভেদে শব্দের পরিবর্তন হয়েছে। পুথিবদ্ধ হওয়ার পর পরিবর্তনের হার কমেছে। এবার আমার কৌতূহল হলো জানার,—এতো এতো জনপ্রিয় চেনা গানের গীতিকার তাহলে অচেনা কেন? তাঁকে জিজ্ঞেস করি : ‘আচ্ছা দাদা, এই জনপ্রিয় গীত বা গানগুলোর গীতিকার অচেনা থাকার কী কী কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?’

পুনরায় তামাক সাজাতে-সাজাতে নিজেকে কিছুটা প্রস্তুত করে উত্তরটি দিলেন : ‘আমি মনে করি, এর প্রথম কারণ হতে পারে… আদি গীতে ভণিতার চল ছিল না।’ আমি তাঁর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে প্রশ্ন করি : ‘তাই বলে গীতিকারের নামটিও জানা থাকবে না?’

উত্তর তিনি দিলেন এভাবে : ‘এ-অনেক কথা। গীতিকারের নাম জানা থাকিলেও অনেক সময় অজানা হয়ে যায়। কারণ, ভণিতাহীন গীত গান। মৌখিক প্রচলন। লেখ্যরূপ না থাকা। তাছাড়া, শিল্পীদেরও দায়বদ্ধতা আছে;—গীত হওয়ার পুর্বে গীতিকারের নাম বলা। তবে আগেকার নারীসমাজ গীতিকারের তাজ পরিধানের ধার ধারেনি।’

পরবর্তী প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলে নেই,—নিত্যগোপাল সরকারের সঙ্গে আমার আলাপ অথবা সাক্ষাৎকার মূলত তাঁর বলা কথার সারমর্ম, যেখানে তাঁর সাধু ও আঞ্চলিক ভাষা মিশ্রিত কথা বলার ধরনটি যথাসাধ্য অনুসরণ করেছি; তবে উনি যেভাব বলেছিলেন তা হুবহু ধরা কঠিন। আমার সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতার অবিকল বয়ান অতএব হুবহু এরকম নয়।

Book written by the author; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

. . .
২০১৭ সালের রমজান মাস। রাত আনুমানিক ৩-টায় নেত্রকোনা উপজেলাধীন কেন্দুয়া উপজেলা সদরে মেইন রাস্তায় বাস থেকে নামি। সাথে প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী। কথা ছিল স্থানীয় একজন আমাদের রিসিভ করবে, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। বাকি রাতটুকু এখন কোথায় কাটাবো জানা নেই। রাত প্রভাত হলে যাত্রা-অভিনেতা রাখাল বিশ্বাসের সাখে দেখা করবো;—এটা ছিলো মূল উদ্দেশ্য।

রাখাল বিশ্বাসের বাড়ি উপজেলা সদর থেকে খানিক দূরে কান্দিউড়া গ্রাম। এমতাবস্থায় কী করা যায় তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। রাস্তায় ক্ষুধার্ত কুকুরের পাল আর পাগল ছাড়া কাউকে দেখছি না। নিরাপদ থাকার জন্য আশ্রয় খুঁজছি তখন। দূরে পাহারাদারের বাঁশি শুনে কিছুটা সাহস পেলেও দেখা মিলছিল না তার। ঠিক সেই মুহূর্তে অচেনা নাম্বার থেকে মোবাইলে কল আসে। রিসিভ করি। অপর প্রান্ত থেকে অপরিচিত একজন বলেন : ‘দাদা আদাব। আমি ছোটন ভাইয়ের ভগ্নীপতি বলছি। আপনি কী গাড়ি থেকে নামছেন? কোথায় আছেন?’

মোবাইলে কথা বলতে-বলতে আমাদের দু’জনের দেখা হয়ে যায়। আমরা তার বাসায় যাই। হাত-মুখ ধুয়ে তাড়াহুড়ো করে তাদের সাথে সেহরি খেতে টেবিলে বসে পড়ি। রাত প্রভাত হলে চলে যাই মদন রেস্টহাউজে। তারপর রাখাল বিশ্বাসের বাড়ি। রাখাল বিশ্বাস যেমন ভালো একজন অভিনেতা, তেমনি লেখক ও গবেষক। দু’দিন ছিলাম। যাত্রা, বাউল দীনশরৎ, গীত, ধামাইলসহ লোকসংস্কৃতির নানান বিষয় নিয়ে কথা হয়। এই পরিচয় ও কাজের সূত্র ধরে পরবর্তীতে (২০২৬ সনে) লেখার প্রয়োজনে তাঁকে ফোন করে জানতে চাই : ‘বনমালী (গো) তুমি পরজনমে হইও রাধা…’ গানটির বিষয়ে। তিনি দৃঢ়কন্ঠে বলেন :

এই গানটি বাউল দীন শরৎ নাথের লেখা নয়। তবে গানটির গীতিকার কে তা আমার জানা নেই। জনপ্রিয় গানটি আমি অনেক শুনেছি।

বাউল দীন শরৎ ও রাখাল বিশ্বাস একই উপজেলায় জন্মেছেন। ফলে দীন শরৎ ও তাঁর গান সম্পর্কে রাখাল বিশ্বাসের অনেক জানাশোনার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া ভণিতায় গীতিকারের নাম না থাকায় গানটি অচেনা গীতিকারে তালিকায় আছে বলে তিনি জানান; আর গীতিকার রাধারমণের প্রসঙ্গ এলে বলেন : ‘এতদাঞ্চলে অমীমাংসিত অনেক গানে রাধারমণের নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি আমার জানামতে একটি দীন শরতের গানও রাধারমণের নামে প্রকাশ ও অনেকে গেয়ে থাকেন। আদি মেয়েলি গীতেও এমনটি লক্ষণীয়।’

Chere dao reshmi churi; Mukunda Das; Artist: Sabitabrata Dutta; Movie: Balika Badhu; Source: Sabitabrata Dutta Topic YTC


আদি মেয়েলি গীতে গীতিকারের আধিপত্য ছিল না। আগের পর্বগুলোয় বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও করেছি। এছাড়া এ-বিষয়ে এখন সকলে কমবেশি ধারণা রাখেন। না-থাকার পেছনে পুরুষশাসিত সমাজে বঙ্গ নারীগণের মানকুলমানের ভয় মূলত দায়ী। ঘরের চৌখাটবন্দী (*চৌকাঠবন্দি) নারী যেন রাঁধবে আর চুল বাঁধবে। নারীর হাতের কাচের চুড়ি ভেঙে যাওয়ার অশুভ ভয় যেখানে সতীত্ব রক্ষার জিঞ্জির। তাইতো চারণকবি মুকুন্দদাস নারী-জাগরণের জন্য গেয়ে উঠেছিলেন :

ছেড়ে দেও কাচের চুড়ি বঙ্গনারী,
কভু হাতে আর প’রো না।
জাগ গো জননী ও ভগিনী,
মোহের ঘুমে আর থেকো না

আঁধার আজও কাটেনি। লোকলজ্জার ভয় আজও নারীকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে গীতে-গানে গাঁয়ের স্বশিক্ষিত নারীকুল আজও পরিচয় গোপন করে নিরলে বান্ধে গান। সমাজের মন যোগানোয় নিজের স্বত্ব সে অকাতরে করে দান। বর্তমান সময়ে অনেকে হয়তো তা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি মাসের কথাই বলি বরং। সদ্য বিগত মাসটির ১৬ তারিখ হবে, কাঠইর-নিবাসী শিক্ষক রাজেশকান্তি দাশের কল্যাণে নারী গীতিয়ালের নিজনাম গোপন করে যাওয়ার পুরোনো অভিজ্ঞতার প্রমাণ মিলল পুনরায়।

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ ও আমি গীতিকবি প্রয়াত মধুসূদন দাসের খবর নিতে তাঁর জন্মভিটা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠইর গ্রামে মাঠপর্যায়ের এক সমীক্ষায় নেমেছিলাম। গ্রাম্য সড়কের পাশে গাছে ঝুলে থাকা সাইনবোর্ডে হঠাৎ চোখ আটকে যায়! সেখানে লেখা ‘কলি ধামাইল দল’। গ্রামের সুব্রত তালুকদার সেতু জানালেন ধামাইল দলটি যিনি পরিচালনা করেন তিনি তার প্রতিবেশী। আমরা সুব্রত তালুকদার সেতুর বাড়িতে যাই। পরিচয় হয় দলনেত্রীর সাথে। দলটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ধামাইল গীত পরিবেশন করে। পেশাদার ধামাইল দল বলা যেতে পারে। বিভিন্ন বয়সের গায়িকা নিয়ে বেশ কয়েকটি ভাগে দলটি গড়ে উঠেছে। কেউ-কেউ একক ধামাইল গানও করে। বাউল গানও করে মাঝেমধ্যে। নিজস্ব ঢোলবাদক আছে দলটির। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্র অগ্নি তালুকদার ধামাইলের মহড়ায় ফাঁকে ফাঁকে তাল টুকতে টুকতে এখন রীতিমতো ঢোলবাদক হয়ে উঠেছে।

Gauri Talukder Dhamail Team; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

পরিচালক বা দলনেত্রীর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় জানা গেল ধামাইল দল গঠনের ইতিহাস। দলটির সত্বাধিকারী থাকেন শহরে। যেখানে ছোট ছোট মেয়েদেরকে ধামাইল নৃত্য ও গান শিখানো হয় অনুষ্ঠানের কথা মাখায় রেখে। নৃত্য ও সুরে আনা হয়েছে পরিবর্তন। সবই করা হয়েছে গ্রাহক টানার জন্য;—কর্পোরেট চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে। ২০১৭ সালের পর থেকে তাঁরা এই বিজ্ঞাপনী কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।

দলের কাণ্ডারি গৌরী তালুকদারের সাথে সাক্ষাৎকারাড্ডা চলছিল। শেষের দিকে সকলে মিলে কিছুটা এলোমেলো কথাবার্তা শুরু হয়। অবান্তর বুঝে ফয়েজ ভাই ক্যামেরা অফ করে দিলেন। ব্যাটারি চার্জ ও ডাটা স্টোরেজের ব্যাপার ছিল যেহেতু। আলাপচারিতার একফাঁকে চা, নুডুলস, বিস্কিট চলে এলো। এদিকে শিল্পীকে উৎসাহ-পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আলাপের একপর্যায়ে জানালেন : ইচ্ছে করলেই তিনি গান লিখতে পারবেন। আমরা তাকে উৎসাহ দিয়ে বলি : ‘আজ থেকে চেষ্টা শুরু করেন গান লিখতে। বিভিন্ন গানের সংকলন পড়বেন। আপনাকে আমরা দীন শরৎ ও রাধারমণের সংকলিত গানগুলো পড়তে দেবো; আপনি পড়বেন, গানের রচনাশৈলী বুঝতে পারবেন সহজে… ইত্যাদি, ইত্যাদি।’

Filed Study: Conversation with Gauri Talukder; Short; Source: thirdlanespace YTC

আড্ডা চলছিল, একপর্যায়ে হঠাৎ তিনি বোমা ফাটালেন : ‘আমি তো একটা গান লেক্কিয়া রাধারমণরে দিছি।’ আমরা চমকে উঠি। ফয়েজ ভাই সাথে সাথে ক্যামেরা চালু করলেন। আমি বলি, ‘কথাটা আবার বলেন।’ নিজেকে তৈরি করে নিয়ে বললেন : ‘একটা গানে, মানে আমি ইয় করছি, রাধারমণের নাম দিছি।’ আমি পুনরায় তাকে প্রশ্ন করি : ‘নাম দিছেন রাধারমণের?’ মাথার ইশারায় আমাকে ‘হ্যাঁ’ জবাব দিলেন গৌরী।

ধামাইল শিল্পীদের মুখে এরকম কথা আমি অনেক শুনেছি আগে। কৌতূহলী না হয়ে তাকে শুধরাতে প্রশ্ন করি : ‘কেন দিলেন? রাধারমণের নাম কেন দিলেন?’ তিনি কোণঠাসা হয়ে মাথা নিচু করে আমার থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিলেন : ‘আমার ভয়ে, যেমন নাম দিয়াম আর…?’ আমি বিলম্ব না করে তার কথার ওপরে প্রশ্ন করি : ‘কী ভয়?’ তিনি যেন এখনও ভয়ে আছেন! আমার কাছে উত্তর দিতে ভয় তার। মাথা নিচু করে আমার থেকে চোখ সরিয়ে লজ্জায় আঁচল টানতে টানতে নিজেকে আড়াল করছেন তখন। আড়ষ্ট-স্বরে উত্তর আসে : ‘ভয় তো কত ধরনেরই আছে!’ এই বলে থমকে গেলেন! তাকে স্বাভাবিক করতে তার হয়ে আমি তখন উত্তরটি পুরা করছি : ‘মাইনশে কইব,—নাহ্! গান লেখে? এইরকম?’

গীতিকারের নামের ‘তাজ’ তার যে-গানে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা আড়াল হয়ে যাচ্ছে দেখে আমি আবারো তার নাম জানতে চাই : ‘কী নাম আপনার?’ স্বাভাবিক উত্তর করেন : ‘আমার নাম গৌরী তালুকদার।’ আমিও তার মহিমান্বিত নামখানা পুনরায় উচ্চারণ করে বলি : ‘গৌরী তালুকদার, গানডা কিতা একটু বলবেন?’ নিজের লেখা গানটি পাঠের ভঙ্গিতে আমাকে শোনালেন গৌরী। তার সাথে সাথে আমিও কণ্ঠ মিলাই :

Filed Study: Conversation with Gauri Talukder; Image Source: Collected; Credit: Sajal Kanti Sarker; @thirdlanespace.com

বাশঁরিয়া বাঁশরিয়া বাঁশির সুরে প্রাণটি রাখা দায়,
বাঁশিতে ভরিয়া মধু পাগল করল কুলবধূ,
কুলবধূর কুলমান যায়।
বাঁশির সুরে অঙ্গ জ্বলে ঘরের জল বাহিরে ফেলে
মনে লয় যাবো যমুনা।
ভাইবে রাধারমণ বলে বাঁশির সুরে অঙ্গ জ্বলে
বাঁশি কারো বাঁধা মানে না।

আমি বললাম : ‘এই শেষ?’ তিনি মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন ‘হ্যাঁ।’ আমি সঙ্গে-সঙ্গে প্রশ্ন করি : ‘কেন আপনে এইখানে ‘ভাবিয়া গৌরী’ বলে, এই কথাটা কেন দিলেন না?’ তিনি এই প্রশ্নে উত্তর না দিয়ে অসহায়ের মত আমার দিকে তাকালেন। আমি তার এ-অসহায়ত্ব দেখে প্রশ্ন রাথি : ‘মানে ভয় কাজ করে? নাকি লজ্জা? নাকি সমাজ কিছু বলবে এজন্য?’ সমাজের প্রসঙ্গ উঠতেই দীপ্ত কণ্ঠে বলেন : ‘সমাজে তো ধরতেও পারে? আমি তো আর কবি না!’

তার কথায় বাধা দেই আমি : ‘কেন? কবি না আপনি, এইটা কে বলল? কবি হইতে গেলে কী লাগে? কোনো বংশ? নাকি কবির ঘরে কবি জন্মে? আপনার কী ধারণা? কবি হইতে গেলে বেশি পড়াশোনা লাগে?’ তিনি মাথা নেড়ে আমার প্রশ্নের মোক্ষম জবাবটাই দিলেন! কবি হইতে গেলে এসব কিছু লাগে না; তা তিনি বোঝেন, আর আমাকেও বোঝালেন। আমি তার কথায় জোর দিতেই বলছি তখন : ‘কবি তো সেই হতে পারে, যে কবিতা লিখতে পারে; যার লেখার জ্ঞান আছে। যেমন, আপনি গান লিখছেন, আপনি গীতিকার!’

তিনি আমার এসব যুক্তি মেনে নিলেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামী যার অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে থাকে, তার গানের গলা কিংবা গীতিকারের তাজ তো বান্নি থেকে কিনে আনা সুতোয় বাঁধা কাঠিতে বান্দর নাচের খেলনা! স্বত্বাধিকারীর নির্দেশে গৌরীরা নাচে-গায়। যাইহোক, অবলা নারীর বন্দিদশা ও সমাজভীতি এখনও কাটেনি;—গৌরী তালুকদার এর বাস্তব উদাহরণ।
. . .

Filed Study: Conversation with Gauri Talukder; Full Conversation; Source: thirdlanespace YTC

. . .

আগের পর্ব :

হাওরপুরাণ-৪ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার

হাওরপুরাণ-৩ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার

হাওরপুরাণ-২ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার

হাওরপুরাণ-১ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার

. . .

লেখক পরিচয় : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 25

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *