
পূর্ণিমা রাতে
চাঁদ কী চুমু খায়
গঙ্গার জলে।
. . .
পাতারা ঝরে
চৈতী হাওয়া দোলে
কাঁপন বুকে।
. . .
আঁধার নামে
সোহাগে বান ডাকে
যৌবন হাসে।
. . .
উড়ল পাখি
গোধূলির আবির
ছড়ায় মনে।
. . .
আকাশ লীন
ঘাসবন উজাড়
শিশির কাঁদে।
. . .
বসন্ত দিনে
দর্পণে শশী দেখি—
প্রিয়ার মুখ।
. . .

কতিপয় হাইকু : পাঠ-প্রতিক্রিয়া
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]
হাইকুগুলো পড়তে বেশ। চর্চিত ধারা মেনে হাইকুগুলো লেখা। জাপানিজরা যেমন লেখেন আর কী! টোনটা এক্ষেত্রে পড়তে ভালো লেগেছে। বাংলায় কাজটি করা বেশ কঠিন। জাপানিজ হাইকু যে-জায়গা থেকে জন্ম নিয়ে থাকে, আমরা সেখানে বিলং করি না। বাংলা ভাষায় লেখা হাইকু যে-কারণে শব্দচর্চায় নিজেকে ফতুর করে। অধ্যাত্মরসের ভিতরে গমনের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে যাপন ও পরিণামের ছবি তুলে আনা সচরাচর হয়ে ওঠে না।
জাপানে হাইকু জেনমার্গে একীভূত থেকে কবিরা লেখেন। যাপন ও পরিপার্শ্বকে নজরবন্দি করেন কবিতায়। মিতকথন সেখানে অলঙ্কার ও অতিরঞ্জন থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল মাত্র নয়,—জেন-বুদ্ধভাবে সাধা যাপন থেকে পাওয়া উপলব্ধির প্রতিভাস বটে। জেন কবি এই বোধিসত্ত্ব প্রতিদিনের জীবনচর্চায় সাধনা করেন, যেটি সেখানে হাইকুর সংক্ষিপ্ত আয়তনে প্রতিফলিত হয়। জেন মানে (আমি এভাবে বুঝি) ‘সহজ’ হওয়ার একগ্রতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করা।
তুচ্ছ দৈনন্দিনের রুক্ষতা, ক্লেশ ও পীড়ার সবটাই হাইকুতে উঠে আসে, তবে জেন কবির তা নিয়ে কোনো অনুযোগ-অভিযোগ থাকে না। পাঁচজনের মতো একে যাপন করেন কবি। জীবনের অন্তিম গতি ও পরিণাম বুঝে ফেলায় নীরবতার শক্তিতে হয়ে ওঠেন বাঙ্ময়। যাপনের ভালোমন্দ সবটুকু যে-কারণে প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্ন। হাইকুর চিত্রকল্পসম পঙক্তি পড়তে সহজ, তবে একে অনুভবে নিয়ে সমাহিত হওয়া জেনভাবে মাথা মোড়ানো ছাড়া বেশ কঠিন!
হাইকুর সংক্ষিপ্ত অবয়বে প্রকৃতি ও পরিপার্শ্ব খোলা তলোয়ার। লুকানোর কিছু নেই। এটি নিরাভরণ, এটি নিস্তরঙ্গ, কিন্তু এটি মৃত নয়। এই ধাত বুঝে কবিতা রচনা শক্ত কাজ। আমরা অভ্যস্ত নই একদম। আমাদের কালচারে ভাবসাধনার প্রকৃতির সঙ্গে জেনের পার্থক্য আছে। গৌতম বুদ্ধের ভাববীজ বহন করে জাপানে এটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য জন্ম দিয়েছিল।
জাপান ঘুরতে যেয়ে রবি ঠাকুরের মনে হয়েছিল দেশটির সর্বত্র ধ্যানের ছবি মূর্ত। তাঁর পর্যবেক্ষণ মিথ্যে নয়। বিপরীতে এটি চরমসত্য ছিল তখনো, এবং এখনো তাই,—ধ্যানমগ্ন সুস্থির একাগ্রতার যে-ছবি জাপানি জীবনধারায় চোখে পড়বে, তার আড়ালে জাপানি সমাজ অকল্পনীয় অস্থির ও সহিংস! সুস্থির শৃঙ্খলায় একাগ্র থাকার সাধনা করতে যেয়ে দেশটি অন্যদিক থেকে তলে-তলে নিজেকে নিঃস্ব করে প্রতিদিন।

এসব কারণে জেন রীতি মেনে হাইকু বেশিদূর লেখা যায় না। সন্ন্যাস না নিলে, জীবনের দৈনন্দিনে সুস্থির থাকার ধীশক্তি রপ্ত না হলে, যাপনের প্রতি পরতে লেগে থাকা ক্ষয় ও পরিণামকে জেন কবির মতো বয়ে চলা সম্ভব নয়। হাইকু আঙ্গিকে অ্যালেন গিন্সবার্গ বা আরো আগে এজরা পাউন্ড কিছু কবিতা লিখেছিলেন। জ্যাক কেরুয়াকও লিখেছেন অনেকগুলো। সেখানে তাঁরা জীবনযন্ত্রণার বেদনা, হাহাকার ও নিরাশাকে অবলীলায় হাইকুতে বদলে নিয়েছিলেন। মন্দ ছিল না সেই নিরীক্ষা। এজরা পাউন্ডের বিখ্যাত একটি হাইকু যেমন এরকম, কবি লিখেছেন :
And the nights are not full enough
And life slips by like a field mouse
Not shaking the grass.
রজনিরা যথেষ্ট নয়
জীবন মেঠো ইঁদুরের মতো গর্তে সেঁধোয়
ঘাসে তবু জাগে না কাঁপন। [ভাষান্তর : স্বকৃত]
এরকম আরো হাইকু আছে পাউন্ডের। আরেকটি কোট করি :
Spring…
Too long…
Gongula…
বসন্ত…
সুদীর্ঘ…
গংগোলা… [ভাষান্তর : স্বকৃত]
চীনে টানা কয়েকবছর থাকতে যেয়ে এজরা পাউন্ডের এই লাভ হলো,—যাপনের ক্রাইসিসকে হাইকুতে ধরেছেন মারাত্মক! জ্যাক ক্যারুয়াক ও গিন্সবার্গও প্রায় অনুরূপ। ক্যারুয়াক যেমন হাইকুবচনে খেদ ঝরাচ্ছেন :
The taste
of rain
—Why kneel?
বৃষ্টির
স্বাদ
কেন নতজানু? [ভাষান্তর : স্বকৃত]
গিন্সবার্গ সমকামী অনুভবকে ধরছেন হাইকুচরণে :
A hardon in New York,
a boy
in San Francisco.
নিউইয়র্কে বইয়া ওইডা খাড়ায়,
ছেলেডা কিন্তু
থাহে সানফ্রানসিসকোয়। [ভাষান্তর : স্বকৃত]
নজিরগুলো এ-কারণে পেশ করা,—কবিতা বিরচণের আঙ্গিক রূপে হাইকুকে জাপানি কেতা থেকে বেরিয়ে অন্যভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। এরকম ‘হাইকু’ যদি লিখতে পারেন কিছু,—আমার মনে হয় অভিজ্ঞতা খারাপ মনে হবে না নিজের কাছে। যাপনকে নির্গলিত করা, দহনকে টেনে বের করে আনার স্পেস সেখানে হাইকু আপনাকে দিতে কৃপণতা করবে না। আর, পাশাপাশি প্রচলিতও লিখলেন;—যখন মনে হবে এই নিরর্থক যাপনকে কোথাও সহজভাবে মেনে নিয়ে ধ্যানমগ্ন জেনসাধকের প্রশান্তিতে বলা যেতেই পারে :
Won’t you come and see
loneliness? Just one leaf
from the kiri tree.
তুমি কি আসবে না, দেখবে না
নিঃসঙ্গতা? কিরি গাছে ঝুুলছে
কেবল একটিই পাতা! [ভাষান্তর : স্বকৃত]
. . .

. . .

লেখক পরিচয় : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .


