দাস্তান-ই-দিলরুবা
[বেগম সামরু, মহ লাকা বাই ও জনাবেআলা সালমান রুশদি]

নেটে জেব-উন-নিসার ‘রুবাই’ তালাশে নেমে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলো সম্প্রতি। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব কন্যার ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’ ইংরেজি ভাষান্তরে সুলভ। কামাল রাহমানের কল্যাণে মাখফিতে সংকলিত গজলের বাংলা ভাষান্তর আমরা পেয়েছি ইতোমধ্যে। আলাদা করে রুবাই অবশ্য পেলাম না কোথাও! উলটো গুগল মহাশয় ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’ (Dastaan-e-Dilrubai) হাজির করলেন সামনে!
উর্দুসাহিত্যে প্রণয়মাখা কবিতা/নজম রচনার রীতি হিসেবে নাকি এর প্রচলন দীর্ঘদিনের। উর্দু বুঝি আন্ডা! যৎসামান্য ধারণা মূলত বাংলা ও ইংরেজি ভাষান্তরে পঠিত কিছু সাহিত্যকর্ম, আর সিনেমা ও গানবাজনার ওপর দাঁড়িয়ে এখনো। উর্দুসাহিত্য নিয়ে জাভেদ হুসেনের আলাপ মাঝেমধ্যে শোনার চেষ্টা করি। আলাপ তিনি ভালোই করেন; তবে কেন জানি ভিতরে দাগ বসাতে পারলেন না আজো! মির্জা গালিব, মীর-তাকি-মীর, আল্লামা ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ থেকে আরম্ভ করে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের খুঁটিনাটি দিকগুলো আলাপে টানেন জাভেদ হুসেন, তথাপি এসব চেখে দেখার কৌতূহল মনে তীব্র করতে পারেননি কখনো! প্যারায় পড়ে অগত্যা তাঁকে শোনা একপ্রকার বাদ দিয়েছি। সমস্যা জাভেদ হুসেনের নয়;—অধম মনে হচ্ছে তাঁর আলাপে সংযোগ করার জন্য অনুপযুক্ত একজন।
যাইহোক, ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’ (দাস্তান-ই-দিলরুবা নামেও ডাকার চল আছে) বলতে কী বোঝায় তা জানার কৌতূহল ততক্ষণে পেয়ে বসেছিল। নেটে ঘাঁটলাম অনেকখানি। গুগল মামা যেসব লিংক হাজির করছিলেন একে-একে, সেগুলো ধরে প্রবেশ গেলাম ভিতরে। কয়েক ঘণ্টার খাটনিতে কী-আর সবটা বোঝা যায়! অবশ্যই না; তবে এটুকু বোঝা গেল,—ফারসি থেকে উর্দুতে আসা কাব্যিক ঐতিহ্য বেশিদিনের পুরোনো নয়। ফারসিতে এর প্রচলন হাজার বছরের কাছাকাছি, কিন্তু উর্দুতে অনুপ্রবেশ বেশি হলে চার-পাঁচশো বছরের হবে।
আচ্ছা, তার আগে উর্দুতে ‘দাস্তান-ই-দিলরুবা’র সারার্থ বলে ফেলি সংক্ষেপে। ‘দাস্তান’ শব্দটি (যেটুকু বোঝা গেল) ফারসি থেকে উর্দুতে ঢুকেছিল। মৌখিক পরম্পরায় গল্প বলার লিখন-কৌশল রূপে একে ব্যবহার করেন কবিলেখকরা। প্রণয়ধর্মী ও নাটকীয় গুণাগুণ সম্পন্ন কাহিনি যখন আখ্যানধর্মী ব্যাপ্তি লাভ করে,—কবিতা ও গদ্যে তাকে ভাষা দিতে ‘দাস্তান’ ভালোই কাজে দেয়। কাহিনি, সেটি এখন সোহরাব-রুস্তমের মতো মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনাঘন কিছু হতে পারে। লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদের অমর প্রেমে রঞ্জিত নাটকীয় গাথা হতে পারে। এমনকি আধুনিক যুগ-সংকটে খাবি খেতে থাকা কাহিনি ‘দাস্তান’-এ ভর দিয়ে লিখে ফেলা সম্ভব। ভাষায় আবেগরঞ্জিত অলঙ্কার, অতিরঞ্জন, উপমা-উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি ছাড়াও বিচিত্র অনুষঙ্গ মিলে গড়ে ওঠে এক-একটি ‘দাস্তান’।
বুঝলাম! দিলরুবা কেন জুড়ছে সেখানে? নেটসূত্রে উত্তরটি এভাবে এলো :—স্ত্রী লিঙ্গবাচক ‘দিলরুবা’ হলেন এমন নারী, যিনি তার নানাবিধ গুণ ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে কারো দিল জিতে নিচ্ছেন। ঘায়েল করছেন বলতে অসুবিধা নেই কোনো। দৈহিক সৌন্দর্য সেখানে ‘দিলরুবা’ গণ্য হওয়ার একমাত্র চাবি নয়। এটি নিঃসন্দেহে অন্যতম, তবে একে একমাত্র ভাবাটা ভুল। বিচিত্র গুণ ও শিল্প-কুশলতার ওপর দখলই কেবল পারে কোনো নারীকে দিল-চোর করতে। নারী,—তিনি হয়তো গীত ও নৃত্য পটিয়াসী। কবিতায় দখল রাখেন। বুদ্ধিদীপ্ত ও সপ্রতিভ। সোজা কথায়, তার চলায়-বলায় নান্দনিক রুচি ও আভিজাত্যের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের ধার যদি ঠিকরে পড়ে,—তাকে আমরা ‘দিলরুবা’ ধরে নিতে পারি। পুরুষের দিল জখম করতে ইনি পারদর্শী!

‘দিলরুবা’র নিকবর্তী শব্দ পাওয়া গেল ‘হসরুবা/হশরুবা’। আল্লা জানে উচ্চারণ সঠিক হলো কি-না! মুন্সী মুহাম্মদ হোসেন জাহ ও আহমদ হোসেন কামার যেমন তাঁদের সংকলিত ‘দাস্তানের’ নাম রেখেছিলেন ‘তিলিস্ম-ই-হশরুবা’ (Tilism-e-Hoshruba)। উর্দু ভাষায় রচিত/ভাষান্তরিত বিখ্যাত দাস্তানের অন্যতম এই সাহিত্য। ‘হসরুবা/হশরুবা’ সেই নারীর কাহিনি বলে, যাকে দেখে ও যার গুণের ছটায় বেচারা পুরুষের হুঁশবুদ্ধি খোয়া যাওয়ার অবস্থা হয়! সোজা কথায় মজনুন হওয়ার পথে ইনি আগাতে থাকেন ভালোমতন। ‘তিলিস্ম-ই-হশরুবা’-র ইংরেজি ভাষান্তর নেটে পাইনি। উর্দু আছে অবশ্য। এর গুণমান নিয়ে বিশেষজ্ঞ-আলাপও চোখে পড়ল কিছু। আর আছে, ‘দাস্তান-ই-হসরুবা/হশরুবা’র সারার্থ অবলম্বনে ওস্তাদ আল্লাহ বখশের এপিক পেইন্টিং!
বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে ছবিটি এঁকেছিলেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। দেখে মনে হবে রাফাইলেট (raphaelite) যুগে আঁকা পেইন্টিং দেখছি, যেখানে প্রাচ্য ঘরানা এসে মিলেছে বেশ। অঙ্কনরীতি নিখুঁত। ফিগারেটিভ ড্রইং ও রংয়ের কুশরী ব্যবহারে কাহিনির ঘনঘটা যত্ন করে এঁকেছেন আল্লা বখশ। এঁনার ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর নিতে হবে দেখছি! ইম্প্রেসিভ! আল্লা বখশের আঁকা ছবিখানায় নজর দিলে ‘দাস্তান’ কী-প্রকৃতির সাহিত্যরীতি সে-বিষয়ে ধারণা অনেকখানি পরিষ্কার হয়।
আমাদের পৌরাণিক সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য ও মৈমনসিংহ-সিলেট গীতিকার কাব্যিক বিস্তারে কাহিনির সারবীজ হলো সম্পদ। কাহিনির ভিতরে কাহিনির অনুপ্রবেশের ভিতর দিয়ে মূল বিষয়বস্তু শাখা-প্রশাখা মেলে সেখানে। ‘দাস্তান’ এদিক থেকে অভিন্ন মনে হলো। অতিলৌকিক তথা মিথরঞ্জিত কাহিনি মুখে বলার রীতি এই আঙ্গিকে এসে কাব্যিক অলঙ্কার, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-সহ বিচিত্র দিকে শাখা ছড়ায়। এর ভিতর দিয়ে দাস্তানে মর্মরিত মূল নারীচরিত্র ও তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত কাহিনি নীড় খুঁজে নেয়।
ওপরে এতক্ষণ ধরে যা-বলেছি,—এর সবটাই অনুমানে বলা। ফারসি-উর্দু বুঝি না একবর্ণ। কানে যদিও বেশ মিঠে লাগে শুনতে। ইংরেজি ভাষান্তর হাতের কাছে সুলভ থাকলে নমুনাগুলো পরখ করে বোঝা যেত কতটা সঠিক ভাবছি ও বলছি এখানে। আন্দাজ জায়গামতো লেগেছে, নাকি ভুল হচ্ছে বেজায়। ভুল বা উলটা বোঝার সম্ভাবনা মাথায় রেখে আগেভাগে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। আগ্রহ যদি অটুট থাকে আগামীতে, সেক্ষেত্রে সময়-সুযোগ বুঝে গভীরে গমনের বাসনা থাকছে। মাফ চাওয়ার প্রয়োজন আশা করি তখন আর থাকবে না।
সে-যাকগে, ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’ যে-কারণে আমার আগ্রহের পারদ ওপরে নিয়ে গেল তাৎক্ষণিক,—সেখানে তিনটি নামের ভূমিকা প্রবল দেখতে পাচ্ছি। বেগম সামরু, মহ লাকা বাই চান্দা ও ‘শয়তানের পদাবলী’ রচয়িতা আমাদের অতিচেনা সালমান রুশদি। কালের বিবর্তনে ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’ ব্যবহারে আগ্রহীরা ভিন্ন সময়রেখায় দেখা দেওয়া চরিত্রগুলোকে বড়শিতে গেঁথেছেন। বেগম সামরু ঐতিহাসিক চরিত্র। মহ লাকা বাই (মনে হলো) কাল্পনিক। সালমান রুশদি চেহারা-সুরতে বাস্তব মানু হলেও, খোমেনির নূরানি চেহারা চোখে ভাসলে রুশদিকে মনে হয় জাদুবাস্তব! সে যাকগে, উর্দু সাহিত্যে রেফারেন্স হিসেবে প্রথম দুজনের নাম প্রায়ই উঠে আসে। এর মূল কারণ তাঁদের নারী হিসেব বেড়ে ওঠা ও নাটকীয় জীবনধরায় নিহিত।

উর্দু সাহিত্যে বেগম সামরু ও মহ লাকা বাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ধাত বোঝার সহজ উপায় হলো শ্রেয়া ইলা অনুসূয়া (Shreya Ila Anasuya) বিরচিত দশ পর্বের ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’কে অনুসরণ করা। শ্রেয়া সেখানে দশজন নারীর কাহিনি বর্ণিয়াছেন। নিজের সময়রেখায় এনারা পুরুষকুলের দিলে আসর করেছিলেন তাদের মধ্যে বিদ্যমান জাদুকরি গুণাবলী দিয়ে। যেমন, বেগম সামরু নামের আড়ালে যে-নারীর জীবনবৃত্তান্ত ইলা তুলে ধরেছেন, তিনি আটারো শতেকর মাঝপর্বে ধরায় জীবিত ও দোর্দণ্ড প্রতাপে থেকেছেন সক্রিয়।
বেগম সামরুর আসল নামখানা কালের খাতায় হারিয়ে গেছে। ফিকশনধর্মী বয়ানে শ্রেয়া তাঁকে ফারজানা নামে কল্পনা করেছেন। মায়ের হাত ধরে দিল্লির পথে ইনি রওয়ানা দিচ্ছেন ১৭৬৫ বা এরকম সময়ে। কেন ও কোথা থেকে রওয়ানা দিচ্ছেন তা-নিয়ে মতান্তর আছে বিশেষজ্ঞমহলে। একদল বলছেন, ফারজানা তার মায়ের সঙ্গে কাশ্মীর থেকে দিল্লিতে আসেন সেইসময়।
অন্যদল দাবি নাকচ করে জানাচ্ছেন,—ফারজানার মা দিল্লিতে বাইজি থাকাকালীন আসাদ খান নামে বিদিত এক রইসজাদার দিল হরণ করেন। রইসজাদা তাকে সম্ভবত নিকাহ অথবা রক্ষিতা করে ঘরে তুলেছিলেন। কোটানার বাসিন্দা মিয়া আসাদ পটল তোলায় বিপাকে পড়েন ফারজানার আম্মিজান। সতীনের সঙ্গে টেকা সম্ভব নয় বুঝে মেয়েকে নিয়ে দিল্লির পথ ধরেন ত্বরিত।
এখানে আবার এই মত দিচ্ছেন অনেকে,—ফারজানার মা ছিলেন তাওয়াইফ। রইসমহলের দিল জিততে পটিয়সী উচ্চস্তরের নারী বোঝাতে শব্দটির প্রচলন ঘটে সেইসময়। বলে রাখা প্রয়োজন,—বাইজি ও তাওয়াইফের মধ্যে প্রভেদ রয়েছে। বাইজিকে মোটের ওপর রক্ষিতার সমপর্যায়ে গণ্য করে ভারতীয় সংস্কৃতি। পক্ষান্তরে তাওয়াইফ হচ্ছে হিন্দু ও বৌদ্ধ আমলে সকল প্রকার কলাবিদ্যায় পারদর্শী নারীর মতো। নামে ‘সেবাদাসী’ হলেও সমাজে একালের সেলিব্রেটির সমানুপাতিক শান-শওকত ও মর্যাদা ভোগ করতেন। অভিজাত বণিক সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় বিত্তশালী হয়ে উঠতেন তারা;—যেখানে তাদের বিশেষ বিদ্যায় পারদর্শিতা, নান্দনিক রুচিবোধ ও উচ্চস্তরের আলাপে তাল মিলানোর সক্ষমতাকে অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ ধরা হতো। একালের হাইক্লাস কলগার্লের সঙ্গে একে মিলানো মনে হচ্ছে রুচিসংগত নয়।
বৌদ্ধপর্বে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ শিষ্য-সহ নগর থেকে নগরে ভ্রমণের ক্ষণে এরকম এক তাওয়াইফের আতিথ্য গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন। তথাগতপ্রেমে লীন নারীর বৌদ্ধ বিহারে ভিক্ষুজীবন বেছে নেওয়ার আবদারে যদিও বুদ্ধ ওইসময় সাড়া দিতে ঘোর অনিচ্ছুক থেকেছেন। নারী নামক কালনাগিনীর খপ্পরে পড়ে সাধনভজন লাটে উঠার ভয় সম্ভবত কাজ করছিল তাঁর মনে। ভিক্ষুরা-যে বিগড়ে বিপথে যাবে না তার গ্যারান্টি পাওয়া কঠিন। খ্রিস্টান চার্চে নানদের দিকে তাকালে তা বোঝা যায় বৈকি। ভ্যাটিকান সিটি থেকে এরকম সব চার্চে সেক্স স্ক্যান্ডালের কমতি নেই কোনো। অসংখ্য ছবি বনেছে এ-পর্যন্ত। দেখেছিও তার অনেকগুলো। আর উমবার্তো একো তো এটি নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাজ করে গেছেন নিজ আখ্যানে!

মুসলমান আমলে তাওয়াইফরা এরকম প্রবল আকর্ষণীয় নারী হয়েই থেকেছেন। তাদের শানমান যে-কারণে বাইজির সঙ্গে সম্যক তুলনীয় নয়। পুরুষের দিল চুরির ঘটনায় দুজনের বিদ্যার ধরন একই;—পার্থক্য মূলত নিজের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বকে জাহির করার গভীরতা ও শৈল্পিক কুশলতায় নিহিত থেকেছে। যাইহোক, তাওয়াইফ হলেও ফারজানার মাকে বিশেষ কার্যকারণে শাহজাহানবাদ থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল মেয়ের হাত ধরে। দিল্লিতে পা রাখার আগে মরণ গ্রাস করে তাকে। তেরো বছরের ফারজানা ঘটনাচক্রে নিজেকে আবিষ্কার করেন দিল্লির বিখ্যাত চৌরাই বাজারে। এখানে একদিন তার মা দিলরুবা হওয়ার বিদ্যা রপ্ত করেন;—হয়ে উঠেন রইসমহলে অপ্রতিরোধ্য নারী। ফারজানাও মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নাচেগান ও শের-শায়েরিতে সুদক্ষ হয়ে উঠলেন দ্রুত।
দিল্লির রইসমহলের দিল চুরি করার বিদ্যা রপ্ত করলেও নিজের দিল তিনি দিয়ে বসেন ইউরোপীয় ভাড়াটে সেনাপতি ওয়াল্টার রেইনহার্ডকে। ইনি আবার ইংরেজ শিবিরের বিপক্ষে স্থানীয় রইসদের হয়ে লড়ছিলেন। দিল্লিতে তাকে লোকজন সামরু নামে ডাকছে তখন। সামরুর সঙ্গে ফারজানার আশনাই একত্রবাসে গড়ায়। তারা বিয়ে করেছিলেন অথবা লিভ-টু-গেদার করছিলেন… এটি নিয়ে আছে মতান্তর। রেইনহার্ড ওরফে সামরু ফিরিঙ্গির ঘর করার সুবাদে ফারজানা অতঃপর বেগম সামরু নামে ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে নেন। জায়গিরের মালকিন হওয়ার সুবাদে বিত্ত ও প্রতিপত্তিতে খামতি থাকেনি। সঙ্গে ছিল জায়গির সামলানোর মতো বুদ্ধিদীপ্ত মেধা ও ব্যক্তিত্ব।
সে-আমলে ভিনদেশির দিল চুরি করা, ধর্ম পালটানো ও দাপটের সঙ্গে অভিজাত্যে পাকাপোক্ত থাকা চাট্টিখানি কথা নয়। বেগম সামরু এসব কার্যকারণে পরে উর্দু সাহিত্যে রেফারেন্স গণ্য হতে থাকেন। হয়ে ওঠেন আখ্যানধর্মী দাস্তানের এপিক চরিত্র। লারা দত্ত অভিনীত চলচ্চিত্রেও তিনি রূপায়িত ইতোমধ্যে। নেটে এখনো এর পাত্তা পাইনি। মনে হচ্ছে বেগম সামরুকে মশলা মাখিয়ে রংদার করেই পরিবেশন করা হয়েছে সেখানে।
বেগম সামরুর ব্যাপারে আপাতত এটুকু। সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস ওরফে শয়তানের পদাবলীকে ‘দাস্তান-ই-দিলরুবাই’ ভাবার কার্যকারণে গমনের আগে ছোট্ট করে বলে নেই,—বেগম সামরুর মতো মহ লাকা বাইয়ের ঐতিহাসিকতা প্রমাণিত নয়। ধারণা করা হয়, তাওয়াইফের মাহাত্ম্য বোঝাতে উর্দু কবিরা এই কাল্পনিক চরিত্রটি গড়ে তোলেন। মহ লাকা বাই অতঃপর কাল্পনিকতার পরিধি ছাপিয়ে বেগম সামরুর মতোই বাস্তবিক চরিত্র হয়ে উঠতে থাকেন। দুটি নারী চরিত্রের গুরুত্ব (যেটুকু বুঝলাম) তা এখানে-যে :
এনারা নারী হিসেবে পুরুষ-শাসিত জগৎকে কিছু বদলে দিয়েছেন তা নয়, তবে নারীসমাজের ওপর পুরুষেরই চাপিয়ে দেওয়া কলাবিদ্যা প্রথমে রপ্ত করা ও পরে এটি দিয়ে পুরুষকে ঘায়েল করেছেন কুশলতার সঙ্গে। তাওয়াইফ ও বাইজি দুজনেই এদিক থেকে পুরুষ-শিকারি।
বলিউডি ছবির জগৎ তাওয়াইফ ও বাইজিকে অভিন্ন (সোজা কথায় রইসজাদার সম্ভোগের উপকরণ বা নাচনেওয়ালা বেশ্যা) করে হামেশা দেখালেও দিল্লির চৌওরি বাজারে নাচে-গানে-শেরে চৌকস বাইজি মাত্রই তাওয়াইফ নয়, যেমন তাওয়াইফ মানেই রইস ও জমিদারের ভোগ্যপণ্যও নয়। বেগম সামরুর মতো ক্যারেক্টার সেখানে ছিল, যারা পুরুষতন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন বেশ চতুরভাবে।
সৌন্দর্য ও কলাকুশলতাকে ব্যবহার করে বেগম সামরু যেমন ধর্মীয় সীমারেখা অনায়াসে পেরিয়ে গেছেন। তাঁকে ওই-যে রেইনহার্ড সায়েব ঘরে তুলল, যেখানে তাদের বিয়ে করা না-করা নিয়ে থাকছে মতান্তর, যেখানে আবার সমাজ সামরুকে সস্তা বাইজি তথা বেশ্যাই ভেবেছে মনে-মনে, কিন্তু বেগম সামরুর সেলিব্রেটি ইমেজের কারণে মুখে রা কাড়েনি। উপরমহলে বসে সমাজের ওপর নিজের অধিকার তিনি ভালোই কায়েম রেখেছিলেন।
বেগম সামরুরা পুরুষতন্ত্রের তৈরি সরঞ্জাম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পক্ষান্তরে পুরুষতন্ত্রের জন্য ফাঁদও বটে; যেখানে পা ঢোকানোর পর পুরুষ বুঝে ফেলে এই নারী হচ্ছে চুম্বকশালাকা;—এর দেহ কেবল ভোগের সামগ্রী নয়;—দেহকে ভোগ করতে হলে আগে তার বিদ্যাকুশলতার সমকক্ষ হওয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত না হলে সে থাকছে অধরা। নিজের ফাঁদে পুরুষের স্বয়ং ধরা খাওয়ার মনস্তত্ত্বটি দিলরুবাকে অতিলৌকিক চরিত্র করে তুলছে। যেখানে সে নিজে হয়ে উঠছে পৃথক সংস্কৃতি। ইন্টারেস্টিং!
যাকগে, এবার শেষ ‘দিলরুবা’ জনাবেআলা সালমান রুশদিতে আসি। ‘মধ্যরাতের সন্তান’ রুশদিকে নিয়ে বিরচিত উপাদেয় আর্গুমেন্টে ফিরোজা জাসাওয়াল্লা (Feroza Jussawalla) তাঁর ‘শয়তানের পদাবলী’ উপন্যাসকে ‘দাস্তান-ই-দিলরুবা’ খেতাবে ভূষিত করছেন। তাঁর মতে, রুশদির এই মহা-বিতর্কিত ও মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে ঘৃণিত আখ্যানকে ইসলামের প্রতি তাঁর বিরাগ না-ভেবে বরং অনুরাগ ও ভালোবেসে লেখা প্রেমপত্র ভেবে নেওয়ার আছে প্রয়োজন। কেন?—এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও যুক্তি ফিরোজা নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেছেন।
সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে বেড়ে ওঠা সালমান রুশদি কিশোরবয়সে যুক্তরাজ্যে গমন করেন। বেড়ে ওঠার সবটাই সেখানে ঘটেছে; কিন্তু ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যৌথপ্রভাব তাঁর মধ্যে থেকেছে অমলিন। নিজের দ্বৈত-নাগরিকত্ব ছাপিয়ে দুটি সংস্কৃতির মিলন ও সংঘাতবিন্দুকে সুতরাং তিনি আমলে নিতে বাধ্য ছিলেন। মুসলমানের ছাওয়াল হিসেবে ইসলামকে সহজাত উত্তরাধিকার রূপে রুশদি বহন করেছেন। বিদেশে বেড়ে ওঠার কারণে মুসলমানি সংস্কৃতির ছাপ তাঁর দেহ-মন থেকে মুছে যায়নি! উর্দু সংস্কৃতি আপনা থেকে তাড়া করেছে পেছনে। ভারতীয় জীবনধারা ও মূল্যবোধকে নিতে হয়েছে গভীর বিবেচনায়।
মুসলমানি সংস্কৃতির বিচিত্র অনুষঙ্গ সালমান রুশদি লালন করছেন দেহমনে;—অন্যদিকে একে নিয়ে মনে জন্ম নিয়েছে জিজ্ঞাসা। যারপরনাই ‘শয়তানের পদাবলী’ ছিল ইসলাম, যেটি বালকবয়সে তাঁর দিল চুরি করেছে,—এখন সেই দিলরুবার সঙ্গে বোঝাপড়ায় গমনের অনিবার্য উপায়।

দিলরুবার সঙ্গে এই রুশদি তাঁর আখ্যানে আলাপ করছেন;—যেমন আলাপ করেছেন ‘মধ্যরাতের সন্তান’-সহ অন্যান্য আখ্যানেও। আলাপে ইসলাম নামধারী দিলরুবা তাকে যা দিয়েছে এ-পর্যন্ত, তার সবকিছু তিনি প্রত্যাখ্যান করছেন… ঘটনা মোটেও সেরকম ছিল না। মুসলমানি সংস্কৃতি তাঁকে দিয়েছে উর্দু গজল ও শের। দিয়েছে সংগীত-সহ আরো নানা ব্যঞ্জন। দিয়েছে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ছাড়াও উর্দু সাহিত্যের দিকপালদের সঙ্গে ওঠবসের সুযোগ। দিয়েছে প্রাণভরে আমির খসরু আর কাওয়াল ও গজলে মাস্ত হওয়ার অবকাশ।
ইসলাম তাঁকে দিয়েছে ঈদ, রমজান পালনের অভিজ্ঞতা। দিয়েছে মরুতে ফোটা ধর্মের বাইরে পারসি ও ভারতীয় প্রভাব আত্মস্থ করে বাড়ন্ত ইসলামি বিশ্বাস ও প্রথাচারে নিবিড় থাকার সুযোগ। এর সঙ্গে রুশদির বিবাদ নেই বরং আছে অনুরাগ। এই ইসলামকে তিনি কি আঘাত করেছেন? ফিরোজা বলছেন, একদম না। এটি তাঁর দিলরুবা। কোন দুঃখে তাকে কষ্ট দিতে যাবেন তিনি! তাঁর বেড়ে ওঠা, লেখক হিসেবে বিরচিত গল্প-আখ্যান ও বিভিন্ন সময়ের কথালাপ ঘেঁটে সেরকম কিছু ফিরোজার চোখে পড়েনি।
ফিরোজার মতে,—সালমান রশদি অনুযোগ হানছেন ওই ইসলামের দিকে, যেটি দেশভাগের কাণ্ডারি, যেটি চাপানো ঘটনা হতে মরিয়া ছিল, এবং যেটি কোরান-হাদিসের দোহাই দিয়ে হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক। যার টানাপোড়েনে পড়ে তিনি হয়ে গেলেন ‘মধ্যরাতের সন্তান’;—অ্যা ‘মিডনাইট’স চিলড্রেন’! এই ইসলামকে সালমান রুশদি দিলরুবা ভাবতে নাচার। এর সঙ্গে থাকছে আলাপ ও অভিযোগ। থাকছে এর যৌক্তিকতা নিয়ে বিবাদ ও কলহ। এর জন্য তাঁকে ইসলামের শত্রু ভাবা প্রকারান্তরে ইসলামের অবমাননা রূপে দেখিয়েছেন ফিরোজা। কেননা, যে-দিল চুরি করে নানা গুণের সম্ভারে, তার সব গুণ নয় সমান মনোহর। ঘায়েল প্রেমিক কাজেই এটি নিয়ে যদি তুলনায় যায়ও, ভাবা সংগত নয় সে ছেড়ে দিয়েছে প্রেয়সীকে।
রুশদি ইসলামকে অনায়াসে ঝেড়ে ফেলতে পারতেন। ঝেড়ে ফেললেও তাঁর পক্ষে সময়ের অন্যতম সেরা লেখক হওয়া কঠিন হতো না। জাদুবাস্তবতার তিনি অন্যতম কারিগর একজনা। কিন্তু ওই-যে ছাড়লেন না ভারতকে, মুসলমানকে, ইসলামকেও… এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়,—এই দিলরুবাকে বাদ দিয়ে তিনি নিজেকে ভাবতে অক্ষম। সুতরাং, ফিরোজা উপসংহার টানছেন,—সালমান রুশদি স্বয়ং সেই দস্তান, আখ্যানসম চরিত্র, ইসলামের সঙ্গে যার রাগ-অনুরাগ-বিবাদ নিয়ে রচিত হতে পারে নয়া দস্তান-ই-দিলরুবাই।
ফিরোজা একে কী নামে ডাকবেন জানি না, দূর ভবিষ্যতে কেউ যদি সালমান রুশদিকে নিয়ে লেখেন কোনো উর্দু আখ্যান, তার নাম দাস্তান-ই-আমির হামজার মতো দাস্তান-ই-রুশদি বোধহয় রাখা যেতেই পারে।
. . .

. . .


