
. . .

ইন্টারেস্টিং! অসাধারণ লাগল শুনে। যতদূর জানি, রবি ঠাকুর নিজের লেখা গানের ব্যাপারে স্পর্শকাতর ছিলেন। তিনি চলে যাবার পরে লোকজন রবি বাবুর গান (তখনো ওই নামে পরিচিতি ছিল এসব গান) অন্য সুরটানে গাইবে এবং তাতে মূলরস হানির সম্ভাবনা থাকছে… ইত্যাদি ভেবে স্বরলিপি করিয়েছিলেন। তাঁর এই স্বরলিপিকরণের ভাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা ও অবদান সেখানে চিরস্মরণীয়। দিনু ঠাকুরের সঙ্গে বসে বহু গানের জন্ম দিয়েছেন রবি।
একশোটির মতো গানের আদি সুর বিষয়ে উনারা যে-তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলোর স্বরলিপিসহ সুরকাঠামো কি রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথের অজ্ঞাতসারে বাদ পড়ে তখন? নাকি গানগুলো রবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত পাঁচ খণ্ডে তখনো সংকলিত হয়নি? ওরকম তো হওয়ার কথা নয়! বিষয়টি মাথায় ঢুকল না কিছু!
খাঁচার পাখি কিংবা সমুখে শান্তি পারাবার-এর মতো বহুলশ্রুত গানের গায়নরীতির আদি ও পরিবর্তীত সংস্করণে তাঁরা করেছেন, হতে কি পারে-না,—রবীন্দ্রনাথ গানগুলো দুরকম করেছিলেন ও গাইয়েছেন তখন। ইন্দিরা ঠাকুর বা সাহানা দেবী হয়তো একরকম শুনেছেন ও গেয়েছেন, দিনু ঠাকুরের সঙ্গে বসে করেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। এই দিকটির ওপর আরো বিস্তারিত আলাপের তৃষ্ণা থেকে গেল। ব্যতিক্রম থাকতে পারে দুটো-একটা গানের ক্ষেত্রে, কিন্তু একশো বিগ নাম্বার! বিশ্বভারতী তা কীভাবে মিস করে গেলেন কে জানে!
এই বিষয়ে আগে কিছু জানা ছিল না। খাঁচার পাখি শুনে নিজের কাছে হতভম্ব লাগছে! আদি সুরটিও হৃদয়কে স্পর্শ করছে এখানে। বর্তমানে প্রচলিত সংস্করণ অনেকে বিচিত্রভাবে গাইছেন যদিও! বাদ্যযন্ত্রের সংযোজন ও ফিউশন সেখানে সাধারণ ঘটনা এখন! সময়ের সঙ্গে ফিউশন ইত্যাদির কারণে গায়কিতে ভিন্নতা ব্যাপক, যদিও মূল কাঠামোর বাইরে চলে যাচ্ছে একেবারে… এরকম মনে হয়নি। বিশেষ করে পীযূষকান্তি এই গানটি এতো ভালো গেয়ে গেছেন,—শুনতে বসে চিত্ত দ্রবীভূত হয় নিমিষে।
তাঁর মতো গায়কি সকলের থাকে না। পীযূষকান্তি কি এই ব্যাপারে কিছু জানতেন না! অনেস্টলি যদি বলি, ঠাকুরের আদি সুরের চেয়ে আমরা এখন যেটি শুনছি নিয়মিত (বিশেষ করে পীযূষকান্তির কণ্ঠে), তার আবেদন মূল ভাবরসকে কানে অধিক তীব্র করে তোলে বলেই মনে হচ্ছে! আদি সুরের সঙ্গে তাল ও টানের কিছু ভিন্নতা ছাড়া বড়ো কোনো দূরত্ব আমার কানে ধরা পড়ল না।
যেটি এখানে ধরা পড়ছে, সেটি হচ্ছে ইশোমশনের ফ্লো পীযূষ নিজ ভাবরসে তীব্র করেছেন;—গানটিকে তা মর্মস্পর্শী করেছে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং চেয়েছেন,—লোকে তাঁর গান শুনবে প্রাণ দিয়ে, ওস্তাদি রাগ-রাগিণীর তাল বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না সেখানে। ধূর্জটিপ্রসাদের সঙ্গে পত্রবাণে জর্জরিত আলাপে চোখ বোলালে এর কার্যকারণ বুঝতে অসুবিধে হয় না। যে-কারণে রাগগুলোকে বাংলা ভাষার সঙ্গে নমনীয় করেছেন অবিরত। বাউল, কীর্তন অঙ্গের রাগ ও লোকসুর জুড়েছেন ব্যাপক। আবার দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে পাশ্চাত্যরীতির গানবাজনা নিয়ে তর্কালাপ ও দ্বিমতের মধ্যে পাশ্চাত্য সুরকে ঠিকই নিজ গানে করে তুলতেন স্বকীয়, যেটি বাংলা ভাষার ধ্বনি ও উচ্চারণরীতিতে প্রবাহিত সুরকে অনার করছে। কী করে করতেন, সেকথা ভাবলে গায়ে শিহরন জাগে!
তাঁর গানকে ওই-যে সকল দিক দিয়ে সম্পূর্ণ বলতেন রবি ঠাকুর, এর ওপর সুধীর চক্রবর্তী চমৎকার বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে। ঠাকুরের মূল চাওয়া ছিল,—কেউ যখন গাইবে তাঁর গান, সেখানে নতুন কিছু জোড়ার চেয়ে জরুরি হচ্ছে দরদ। সে ওই নিবেদন থেকে গাইবে, যেন গানের কথায় মর্মরিত ভাববস্তুকে তা পূর্ণরূপে প্রকাশ্য করবে। অর্থ ও দ্যোতনাকে প্রকাশ্য করবে শ্রোতার মনে।
যাইহোক, পুরো অনুষ্ঠান শুনতে ভালো লেগেছে। রবি ঠাকুর গানে কীভাবে রাগ জুড়তেন ও স্বকীয়তাগুণে তা হয়ে উঠত বাংলা ভাষার সঙ্গে মাননসই, তার অনেকখানি উঠে এসেছে। স্বরলিপি বহির্ভূত সুরগুলোও কতই-না মনোহর! জয়তু ঠাকুর!🙏
. . .

আমার কাছে স্বাগতালক্ষ্মীর কণ্ঠের দরদ মনে হয় সুচিত্রা মিত্রকেও ছাড়িয়ে গেছে।
. . .

হ্যাঁ, স্বাগতালক্ষ্মীও খুব ভালো শুনতে। আসলে রবীন্দ্রনাথ সবসময় চাইতেন, তাঁর গানে কথার মর্ম ও ভাবরসকে শিল্পী আগে হৃদয়ঙ্গম করবেন, তারপর গাইবেন, যেখানে স্বরলিপি তাকে সাহায্য করবে গানের স্ট্রাকচার ধরিয়ে দিতে। এখন সেখানে যদি কিছু বিচ্যুতি ঘটেও যায়, কিন্তু গায়কিতে ফোটে ওঠে প্রাণ, ঠাকুর মনে হয় না মাইন্ড করতেন।
খাঁচার পাখি তো আদতে কবিতা, যার মধ্যে গীতিধর্মী গুণ রবি ঠাকুর বুনেছেন ভালো করে। এখন পীযূষ গেয়েছেন আর্দ্র বিষাদে হাহাকারঘন দরদ মিশিয়ে। স্বাগতালক্ষ্মী গেয়েছেন কণ্ঠ ওপরে তোলে, যেখানে আবার টানগুলো ঠিকই ইমোশনকে প্রবাহিত করছে।
অনেকরকমভাবে গাওয়া যেতে পারে, আমাদের এখানে আনুশেহ আনাদিল যেমন গেয়েছেন রক ও ফোকটানের সংমিশ্রণে। গানের কথায় মর্মরিত ‘মুক্তির বেদনা’ তাতে অনেকখানি হারায় বটে, রবিগানের মৌলসুরের সঙ্গে দূরত্বও অমোঘ করে, তবে একালের আরবান সেটআপ বিবেচনায় নিলে শুনতে খুব-যে মন্দ লাগে এমন নয়।
. . .

রবীন্দ্রনাথ বহুমাত্রিক, ফলে গুণী শিল্পীরা নিজেদের গুণাগুণবোধ থেকে তাঁকে ধরতে চেয়েছেন। ভবিষ্যতেও চাইবেন। শেক্সপিয়ার মিউজিয়ামে ক্ল্যাসিকাল ও মডার্ন, দুটো ধারাই চলে। বহুমাত্রিকতার বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে চলমানতা…
. . .

বিদায় নেওয়ার আগে মনে হলো ‘কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে’ গানটির উল্লেখ করা প্রয়োজন। দুই আলাপি অনুষ্ঠানের শেষ দিকটায় এসে যথার্থ বলেছেন,—সিংহভাগ শিল্পী এই গানে গুঞ্জরিত কথার মর্ম উলটা বুঝে গ্যালন গ্যালন চোখের জল মিশিয়ে গানটি গাইতে থাকেন। কথায় যদিও এতটা কান্না দূরে থাক, বরং নিষ্ফলতার নিরুচ্চার বেদনা আছে।
এখন, কোমল অঙ্গে গাইলে একরকম, যেমনটি কবীর সুমন গিটারের সঙ্গে লয়তান মিলিয়ে গেয়েছিলেন। আবার সেই যুগে পঙ্কজকুমার মল্লিক সিনেমায় গেয়েছেন সিনেদৃশ্যের সঙ্গে মিল করে, যেখানে রবির চাওয়া পূরণ হয়নি তা বলা যাবে না।
রবীন্দ্রনাথ আবার সিনেমায় তাঁর গানের ক্ষেত্রে ছাড় দিতেন দৃশ্য ও কাহিনির কথা ভেবে। এই গানটির জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্তের গায়কিতে এমন এক নির্লিপ্ত কিন্তু গভীর ইমোশন থাকে, মনে হয় খুব সহজ করে গাইছেন, কিন্তু কোথায় যেন হৃদয়ে তরঙ্গ দিয়ে যায়। রবিগানকে বিচিত্র মাত্রায় গাইতে পারা তাঁকে প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য জরুরি। কেবল কথার মানহানি ঘটলে বা অকারণে যাচ্ছেতাই হতে থাকলে, সেটি হয়ে ওঠে পীড়াদায়ক।
. . .

আমার কৈশোরে সুবিনয়ের কণ্ঠ এমনভাবে অন্তরে গেঁথে গেছিল-যে ওখানে আর এত গভীরভাবে ছায়া অন্যেরা ফেলতে পারেনি। তবে অনেকেই অসাধারণ গেয়েছেন।
. . .

“একালে রবিগান আমরা কত-না রকমফেরে গাইছি। সবটা খারাপ হচ্ছে তা বলা যাবে না। বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা মোটের ওপর যুগানূকূল। এছাড়া নতুন প্রজন্মের কাছে রবিগানকে পৌঁছানো কঠিন হতো। রবীন্দ্রনাথ একালে বেঁচে থাকলে বিষয়টি বুঝতেন বলেই মনে হয়। যুগের ভাষা পড়বার ধীশক্তি তাঁর ছিল। মনে-মনে কষ্ট পেতেন হয়তো, তবে দিনশেষে মেনে নিতেন বলে ধারণা করি।”
. . .
“না বলে পারলাম না যে, আমার কিন্তু পপ আঙ্গিকের ভঙ্গিতে রবি ঠাকুরের গান বেশ ভালোই লাগে।… মনে আছে যেমনটা সোমলতা গেয়েছিল অল্টার রকের ভঙ্গিতে?”
. . .
“কেবল পপ নয় তাহসিন ভাই, নির্ভেজাল রক মেজাজেও-যে সবসময় খারাপ লাগে শুনতে, তা কিন্তু নয়। রবীন্দ্রনাথ তো আসলে এমন সামগ্রী, তাঁকে নানাভাবে ভাঙা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ঠাকুরের গানের ভাণ্ডারে বিচিত্র গান যেহেতু রয়েছে, একালের মেজাজ বুঝে নিরীক্ষা হতে পারে ও হওয়া উচিত।
উত্তীর্ণ নিরীক্ষার সংখ্যা কম নয় সেখানে। ঋতুপর্ণ ঘোষ করেছেন। কিউ ওরফে কৌশিক তো ‘তাসের দেশ’-এ রবিকে ভেঙে নতুন করে গড়েছেন। দক্ষিণ ভারতীয় গায়িকা সুশীলা রামানকে দিয়ে গোপন কথাটি যেভাবে গাইয়েছেন, ওরকম ডার্ক অ্যাম্বায়াস ও সেক্সচুয়াল ডিজায়ারের মিশ্রণ… চমকে উঠতে হয়।”
. . .
রবিগানের তরি ও অন্যান্য : একপশলা নেটালাপ-১
বিভাগ : নেটালাপ
তারিখ : জানুয়ারি ০৭, ২০২৬
. . .

সুর বাণী দর্শনের গভীরতা প্রভৃতিতে মানবমননের যে-অতল স্পর্শ করতে পারে আমাদের পূর্বসূরীদের গায়কি ও নিবেদন, তা অতিক্রম করা কষ্টসাধ্য, কিন্তু অসম্ভব নয়; যেমন পরবর্তী প্রজন্মের স্বাগতালক্ষী বা রূপা গাঙ্গুলি… এসব আমাদের গভীরে স্পর্শ করলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে মনে হয় না ঐ-আবেদন বা প্রয়োজনটা আছে। তবে ফিউশনের কারণেই কিন্তু এ-প্রজন্ম রবিগান শুনছে, এটাও বিবেচ্য। নষ্ট এ সময়ে এতটুকু ভালো লাগাও কম কি!
. . .

রবিগানের একটি মস্ত সুবিধা কিন্তু আছে কামাল ভাই। স্বীকৃত গায়কি এখানে খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। শ্রোতাদের একাংশ থেকেই যাবেন, যারা ঐতিহ্য রূপে একে প্রজন্ম পরম্পরায় লালন করবেন। একে যদি শুদ্ধ গায়কি ধরি, সেক্ষেত্রে এটি অনেকটা ক্রিকেটের ওই টেস্ট ম্যাচ ফরমেটের মতো চর্চিত হতে থাকবে। সময়ের সঙ্গে সেখানে হয়তো যন্ত্রানুষঙ্গে নতুনত্ব যোগ হবে।
অন্যদিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চলবে সমানে। তবে, রবীন্দ্রনাথের গানের বাণীর আবেদনকে উপেক্ষা করা কঠিন থাকবে সবসময়। গানগুলো কথার ব্যঞ্জনা ও গভীরতায় এতটাই হৃদয়স্পর্শী, একে উপেক্ষা করে যা-তা আপনি করতে পারবেন ন। যে-ঘরানাই শিল্পী লাগান সেখানে, একটি ভারসাম্য ছাড়া আগানো যাবে না।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে সুরের মূল বিষয়গুলো এমনভাবে জুড়েছেন, ইচ্ছে করলেও আপনি সেখানে বাড়তি ওস্তাদি দেখাতে পারছেন না। মন চাইল শাস্ত্রীয় সংগীতের কালোয়াতি জুড়ে দিলাম, দেখবেন শ্রোতা সেভাবে নিচ্ছে না। রক-মেজাজে গায়নের ক্ষেত্রেও চুজি হতে হচ্ছে। যেসব গানে রবি এই পরিসর রেখেছেন, সেগুলো এখানে নতুন করে শুনতে ভালো লাগবে। কিন্তু ‘দূরে কোথাও’-র মতো অজস্র গানে, যেখানে একাকীত্বের মর্মবেদনা সুতীব্র, সেগুলোয় মাথা খাটাতে হবে অনেক। সম্ভব হবেও না সবসময়।
. . .

যন্ত্রযোগ ও ইম্প্রোভাইজেশনই কিন্তু নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে। কোনোটাকেই ঊন বলা কঠিন। রবিগানের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটা স্বাভাবিক।
. . .

নিঃসন্দেহে। গান শোনা ও ভালো লাগার ক্ষেত্রে ‘সংস্কার’ মনে হয় বড়ো ভূমিকা রাখে। কথার কথা, শচীন কর্তার গান তিন বেঁচে থাকার সময় থেকে আজ পর্যন্ত অনেকে ভালো গাইছেন। যন্ত্রযোগে বৈচিত্র্য এনে গেয়েছেন বা গাইছেন এখন, আবার মূল কম্পোজিশনে স্থির থেকেও অনেকে গেয়ে থাকেন। তথাপি, তাঁর ওই আনুনাসিক স্বরে গানগুলো শোনার তাড়না সব ছাপিয়ে যায় সেখানে।
শচীন কর্তা খুব-যে গ্রামারে স্থির দাঁড়িয়ে গাইতেন, তাও নয়। গায়নরীতি এখানে তিনি নিজের মতো গড়েপিটে নিয়েছিলেন। এবং তা এতটাই স্বকীয় হলো-যে, শ্রোতারা ঠিকই গ্রহণ করলেন। কবীর সুমন হয়তো এ-কারণে বলেছিলেন, শচীন দেব বর্মণ ঈশ্বর। নিজের নিয়ম তিনি নিজে গড়েন-ভাঙেন। রবিগানের সুরকাঠামোয় রবীন্দ্রনাথও তাই।
সুধীর চক্রবর্তী এই দিকটির ওপর চমৎকার আলো ফেলেছিলেন। তাঁর ভাষায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে সুর বসানোর ক্ষেত্রে নিখাদ পাশ্চাত্য রীতি মেনেছেন। পশ্চিমে একটি গান যখন তৈরি হয়, তখন তারা সর্বাঙ্গ-সম্পূর্ণ করে তৈরি করে। ইম্প্রোভাইজেশনের অবকাশ বড়ো একটা থাকে না। যেটি থাকে তা হলো, সময়ের সঙ্গে গানের মূল কাঠামো অটুট রেখে বাদ্যযন্ত্র ও গায়কিতে নতুনত্ব আনার নিরন্তর প্রয়াস। এটিকে তারা ইম্প্রোভাইজেশন বলে বুঝে নেয়। যেমন, বব ডিলানের গান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিলানের চেয়ে অন্যদের কণ্ঠে শুনতে অধিক ভালো লাগে। গানের মূল রীতি সেখানে ডিলানকে মনে করিয়ে যায় অবধারিতভাবে, কিন্তু যন্ত্রযোগ ও গায়কির গুণে মনে হয় নতুন কিছু শুনছি। রবিগানের ক্ষেত্রেও এটি অকাট্য।
যন্ত্র ও গায়কির স্বাধীনতা এখানে অবারিত, তবে গানের মৌল ভাব ও সুরকাঠামোকে স্কিপ করার চান্স বিশেষ নেই। দরকারও নেই আসলে। যেহেতু, রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলে গেছেন, আমার গানে আমি তো কোনো ফাঁক রাখিনি। সবটাই সম্পূর্ণ করে রেখেছি। যে-গাইবে তার কাছে আমার প্রত্যাশা হলো দরদ ও নিবেদন।
এই জায়গা থেকে যদি দেখি, রবিগানে ইম্প্রোভাইজেশন মানে হচ্ছে গানের কথায় মর্মরিত বার্তা শিল্পী নিজের দেশকাল ও পরিস্থিতির সাপেক্ষে কীভাবে পড়ছেন, এবং পড়াটা তাকে দিয়ে হৃদয়গ্রাহী কিছু করিয়ে নিতে পারছে কি-না। যদি করিয়ে নেয়, তাহলে সেটি রবিগানকে নিয়ে যাচ্ছে নতুন উচ্চতায়।
দেব্রবত বিশ্বাস যেমন প্রথাগত বাদন ভেঙে গেয়েছিলেন তখন। ছিছিক্কার উঠেছিল। প্রমাণিত হতে সময় লাগেনি-যে, দেবব্রতর গায়নশৈলী রবিগানের মৌলসুরে কোনো অনর্থ ঘটায়নি, তিনি কেবল গায়নরীতি পালটে নিচ্ছিলেন। পীযূষকান্তি যেমন রবিগানের সঙ্গে ভিডিও-দৃশ্য ধারণকে সময়ের অনিবার্যতা ও নতুন অর্থ তৈরির সংকেত রূপে এলাউ করেছিলেন।
গান মূলত শোনার বিষয় হলেও, এখন তা দেখারও বিষয় বটে। আমাদের চোখ ও কান দুটোই এখানে এই সংযোগকে পড়তে ও অর্থ করতে শিখে গেছে। এটিও একধরনের ইম্প্রোভাইজেশন। প্রথমে পারেনি, কারণ ওই পূর্ব-সংস্কার। এটি এখানে বড়ো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় প্রায়শই। আমরা কেউ সম্ভবত এর থেকে মুক্ত নই।
. . .
সংযুক্তি :
মুখতিয়ার আলীর সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল সন্ত কবীরে ওপর শবনম বীরমানির অপূর্ব ত্যথচিত্র হাদ-আনহাদ দেখে। বুল্লে শাহর গানে যেমন পাকিস্তানের সাঁই জহুর স্রেফ কানের ওপর নিজের রাজ কায়েম করেন, কবীর-গানে প্রহ্লাদ টিপ্পানি ও মুখতিয়ার আলীর মতো শিল্পী নিখাদ হয়ে ওঠেন।
কবীরের একই ভজন আমরা অনুপ জালোটার কণ্ঠে সেই কবে থেকে শুনে আসছি অবিরত! আজো একইরকম অপূর্ব লাগে কানে। অনুপ জালোটা একে তাঁর কথার মুন্সিয়ানা দিয়ে আরো প্রলম্বিত করেন। গানের সঙ্গে গানের ইন্টারপ্রিটেশন স্বয়ং অভিন্ন হয়ে ওঠে।
কবীরগানে ইম্প্রোভাইজেশন অবারিত, কারণ এটি প্রাচ্য রীতি মেনে ইম্প্রোভাইজেশনের সুযোগ অবারিত রেখেছে। এগুলো বাউল গানের মতোই অঞ্চলভেদে যে-সুর ও রাগ-তাল বিরাজিত, সেগুলোকে অবলীলায় জুড়তে জানে।
. . .

যে-কারণে রবিঠাকুর বলেছিলেন, তাঁর গান সম্পূর্ণ, সুরে ছন্দে বাণীতে এটাকে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কানের জন্য এটাকে ইম্প্রোভাইজ করা যেতে পারে, কিন্তু অন্তর থেকে তা দূরে সরে যাবে তখন। ঐশ্বরিক বলে যে একটা কথা আছে তা প্রিসলির এ-গানটা শুনলেই বোঝা যায়, আরো অনেক, অনেকে গেয়েছেন ওটা, কিন্তু প্রিসলি যেখানটায় শ্রোতাকে নিয়ে যায় সেখানে কি কেউ পৌঁছাতে পারে!
. . .

এলভিস প্রেসলি জাদুকর ছিল। রোমান্টিক রকের দেহে চোরাস্রোতের মতো সাইকেডেলিক ফ্লেভার তাঁর গানে মিশে থাকে। তাঁর কণ্ঠস্বর একে যেভাবে পিক করেছে তখন, এর অনুকরণ কারো পক্ষে সম্ভব নয়। মজার ব্যাপার হলো, You are always on my mind কিন্তু কাভার সং। গোয়েন ম্যাকক্রে ও ব্রেন্ডা লি রক ব্যালাডটি আগে গেয়েছেন। শুনতে যথেষ্ট ভালো। কিন্তু এলভিস যখন গানটি তাঁর কণ্ঠে নিলেন, ব্যালাডের আবহ গেল পালটে।
নিজের গানের পাশাপাশি এলভিস অন্য শিল্পীর গান যখনই কণ্ঠে তুলেছেন, সেটি তাঁর স্বকীয় প্রতিভাগুণে অচেনা ও নতুন হয়ে দাাঁড়িয়েছে। ঐশ্বরিক ক্ষমতা মানতে হবে একে।বব ডিলানের সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা তো এলভিস স্বয়ং, এবং সেটি তাঁর ওই গানকে নিজের তরিকায় আশ্চর্য পালটে দেওয়ার ক্ষমতাটির জন্য।
খেলাচ্ছলে ডিলানের বেশ ক’টি গান এলভিস কাভার করেছিলেন। তার মধ্যে Don’t Think Twice It’s All Right গানটি শুনে কার বাবার সাধ্যি যে-বলবে,—এইটা ডিলানের ফোক টিউনিং থেকে বেরিয়ে এসেছিল একদিন! আমাদের এখানে এই ক্ষমতা ছিল কিশোর কুমারের মধ্যে। একেই হয়তো আমরা সহজাত প্রতিভা বলে বুঝি।
. . .

রবিগানের তরি ও অন্যান্য : পূর্ববর্তী নেটালাপের লিংক
রবিগানের তরি ও অন্যান্য : একপশলা নেটালাপ-২
. . .



