পোস্ট শোকেস - বিবিধ ও বিচিত্র

চৈত-পরব ও সন : সজল কান্তি সরকার

Reading time 7 minute
5
(13)
Bangla New Year Celebration; Image Source: Collected; Pinterest

‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। বাঙালি পার্বণের সহজ পরিসংখ্যান। কিন্তু না! এ শুধু কথার কথা। কেবল চৈত্রমাস জুড়েই আছে সূর্য ব্রত, ধর্ম ব্রত, গঙ্গা ব্রত, ব্রহ্মা ব্রত, বন্দকুমারী ব্রত, বাঘের শিন্নি, আড়ক, বাঘের ব্রত, ব্যাঙাব্যাঙির বিয়া, বিপদনাশিনি ব্রত, গোষ্ঠ ব্রত, গোপাল ভোগ, লক্ষ্মী ব্রত, ধানের ক্ষীরবাস ব্রত বা ধানের তেলুন্দা ব্রত, ধানের আগলওয়া, উগার শুদ্ধি, গৃহ শুদ্ধি, কামেক্ষা ব্রত, ঝটপট ব্রত, লোট, কল্কীনারায়ন ব্রত, বাসন্তি ব্রত, বিশ্বকর্মা ব্রত, শিবের ব্রত, পূর্ণিমা ব্রত, বান্নি বা মেলা, চড়ক, সাপান্ত, শিলান্ত ও বসন্তসহ অসংখ্য ব্রত-পার্বণের নানা বিধান। চৈতের নিদান কাটে যেন ব্রত-পার্বণের বিচিত্র লোকবিধানে। ভাটির জনজীবনে চৈত মাস ও নিদান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। চৈত্রমাস হলো নিদানের মাস। নিয়তির মাস। লোকবিধানের মাস। ব্রত-পার্বণের মাস। বলতে গেলে সারামাস জুড়ে প্রাণরক্ষা যেমন-তেমন, ফসল রক্ষার দায় নিয়ে ব্রতাচার, শিন্নি, উপাসনা, দোয়া, পাঁচালীপাঠসহ লোকাচারে সমৃদ্ধ অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকে। সারামাসের লোকাচারের পরিসমাপ্তি ঘটে চৈতের শেষ দিন ‘চৈত-পরব’ অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে দিয়ে।

গ্রামীণ জীবনাচারে বাংলা সনের বা ঋতুরাজ বসন্তের শেষ দিনটিই ‘চৈত্র-সংক্রান্তি’ বা ‘চৈত-পরব’ উৎসব রূপে পালিত হয়। নগর জীবনে যা ‘বর্ষবিদায়’ অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সৌরনিয়মে এই দিনটিতে বিষুবরেখার প্রভাব বিদ্যমান থাকে বলে কারো কারো মতে তা ‘বিষুব সংক্রান্তি’ বা ‘মহাবিষুব সংক্রান্তি’। তবে ভাটির জনজীবনে তা চৈত্র-সংক্রান্তি বা চৈত-পরব নামেই জীবনঘনিষ্ঠ। বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালিত হয়। ভাটির ময়ালে পহেলা বৈশাখ ‘সন’ হিসেবে লোকমুখে মান্য ও পালিত হয়ে আসছে।

Boisabi Festival; New Year celebration in Hills; Source: Mini Stories YTC

ত্রিপুরা অঞ্চলে বর্ষবিদায় এবং বর্ষবরণ দুটোই ‘বৈসুক’ (বৈশুখ) উৎসব নামে খ্যাত। মারমাদের কাছে তা হলো ‘সাংগ্রাই’। মারমাদের আরেকটি অন্যতম উৎসব হচ্ছে ‘পানি উৎসব’। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের মাঝে এটি ‘বিঝু’ (বিজু) বা ‘বিষু’। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিঝু বা বিষু … তিনটি শব্দের আদ্যাক্ষর মিলে আদিবাসীদের প্রধান অনুষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে ‘বৈসাবি’। ‘হারি বৈসুক’ বা ‘হারবিষুব’ও একটি চৈতি উৎসব যা ঊনত্রিশ চৈত্র পালিত হয়। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে চৈত্রসংক্রান্তিকে ‘মূল বিঝু’ আর তার আগের দিন অর্থাৎ হারিবিষুকে ‘ফুলবিঝু’ ও পহেলা বৈশাখকে ‘নয়াবঝর’ বা ‘গোর্জ্যাপোর্জ্যা’ দিন বলে অভিহিত করা হয়।

আদিগ্রন্থ পুরাণে বর্ণিত আছে মহারাজা দক্ষের সাতাশজন পরমা সুন্দরী মেয়েদের নামানুসারে সৌরমণ্ডলে সাতাশটি নক্ষত্রের নামকরণ করা হয়েছিল। এ-সাতাশজন কন্যার নাম হলো অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আদ্রা, পুনর্বসু, পুষ্যা, অশ্লেষা, মঘা, পূর্ব-ফাল্গুনী, উত্তর-ফাল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মুলা, পূর্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, ধনিষ্ঠা, শতভিষা, পূর্ব ভাদ্রপদা, উত্তর ভাদ্রপদা ও রেবতী। মেয়ে চিত্রার নামানুসারে হয়েছে ‘চিত্রা নক্ষত্র’। আর চিত্রা নক্ষত্রের নামানুসারে চৈত্র মাস। বিশাখা’র নামানুসারে ‘বিশখা নক্ষত্র’, যার থেকে আমরা পেয়েছি বৈশাখ মাস।

বারো রাশিচক্রে চাঁদ বিশাখা নামে নক্ষত্রে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা দেখায় বলে সেই মাস বৈশাখ। একইভাবে জ্যেষ্ঠা’য় দাঁড়িয়ে জৈষ্ঠ্য, পূর্বাষাঢ়ায় দাঁড়িয়ে আষাঢ়, শ্রবণা’য় দাঁড়িয়ে শ্রাবণ, ভদ্রপদা’য় দাঁড়িয়ে ভাদ্র, অশ্বিনীতে দাঁড়িয়ে আশ্বিন, কৃত্তিকা’য় দাঁড়িয়ে কার্তিক, মৃগশিরা’য় দাঁড়িয়ে অগ্রহায়ণ, পূষ্যা’য় দাঁড়িয়ে পৌষ, মঘায় দাঁড়িয়ে মাঘ, ফাল্গুনীতে দাঁড়িয়ে ফাল্গুন ও চিত্রা নক্ষত্রে দাঁড়িয়ে চাঁদ পূর্ণিমা দেখায় বলে চৈত্র মাস হয়। আর, এসব নক্ষত্র অনুযায়ী মাস নিয়ে হয় সৌরসন, বঙ্গাব্দ বা সৌরবর্ষ।

বর্ষ শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে বর্ষণ বা বৃষ্টি। তাহলে বর্ষণ বা বৃষ্টি থেকেই কি বৎসর হলো? আবার সংস্কৃত ভাষায় অব্দ শব্দের অর্থ মেঘ বা জলদ। কেমন জানি বর্ষ, বর্ষণ, বৃষ্টি, অব্দ, মেঘ, জলদ মিলে যায়। তবে বঙ্গীয় শব্দকোষ এবং বাঙ্গালা শব্দকোষ, দুটি অভিধানেই রয়েছে ‘বরষ’ শব্দের অর্থ ‘বৎসর’। যেখানে আবার ‘বরষ’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ বর্ষ থেকে যা তদ্ভব হয়ে ‘বরষ’ রূপ ধারণ করে ‘বৎসর’ হয়েছে।

রাজা শশাঙ্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষপঞ্জিকা লিপিবদ্ধ করেন বলে মত প্রচলিত আছে। এ-সময়ে বৈশাখি পর্বেরও আভাস পাওয়া যায়। পর্ব শব্দের বিশেষ পদ ‘পরব’, ‘পার্বণ’ ‘সংক্রান্তি’ ইত্যাদি। বৈদিক যুগেও সৌরসনের মাসচক্রে বৈশাখের সন্ধান মিলে, যেখানে মাস হিসেবে বৈশাখের স্থান ছিল দ্বিতীয়। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে অনুষঙ্গপাদের একটি শ্লোকে বৈশাখের স্থান চতুর্থ বলে উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় ও পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণগণের মতে বৈশাখের অবস্থান বছরের মাঝামাঝি ছিল। তারপর ভারতীয় সৌরসন গণনার পদ্ধতি চালু হয়।

Sketch: Mughal Emperor Akbar the Great; Image Source: Collected; Getty Images

মোগল সম্রাট আকবর ‘সুবে বাংলা’ প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের ফসল কাটার মৌসুম ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে রাজ জ্যোতিষী ও পণ্ডিত আমির ফতেহউল্লাহ্ সিরাজী সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণ, ভারতীয় সৌরসন ও আরবি হিজরি সনের সমন্বয়ে ‘ফসলিসন’ প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। তবে সনগণনা কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ ৫ নভেম্বর থেকে। পরবর্তীতে ফসলিসনের নাম হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ। তখন থেকে বৈশাখ বছরের প্রথম মাস। শুরু হয় বর্ষবরণ।

মাস হিসেবে বৈশাখকে প্রথম গণ্য করার প্রথা ও মর্যাদা বেশিদিনের নয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে নববর্ষ পালনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশদের বিজয় কামনায় পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে তার আভাস পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ছায়ানট বিশেষভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু করে।

১৯৫০-এর দশকে ভারতবর্ষের বিচারপতি পান্ডের নেতৃত্বে একটি কমিশন তৈরি হয়। ড. মেঘনাদ সাহা ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ আরও পণ্ডিতগণ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কমিশনে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উপস্থাপন হলে ‘নিখিল বঙ্গ সারস্বত সমাজ’ তা প্রত্যাখান করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বিষয়টি উল্লেখ করেন। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বাংলা বর্ষবরণকে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে নিয়ে আসেন। তাই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। বৈজ্ঞানিক ব্যখায় যেখানে পহেলা বৈশাখ ১৫ এপ্রিল হচ্ছে যুক্তিযুক্ত।

Was Akbar or Shashank the founder of Bangabhab? Nrisingha Prasad Bhaduri; Source: Nrisingha Prasad Bhaduri YTC

ফিরে আসি মূল বিষয় চৈত্র-সংক্রান্তিতে। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপ থেকে পরিত্রাণ ও বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত বৃষ্টি লাভের জন্য সূর্যের তেজ প্রশমনে কৃষিসমাজ সুদূর অতীত থেকে নানা অনুষ্ঠান করে আসছেন। মাসজুড়ে সূর্যের কৃপা প্রার্থনা করে বিভিন্ন ব্রত পালনের মাধ্যমে মাসের শেষ দিনটি চৈত্র-সংক্রান্তি হিসেবে বিশেষভাবে পালন করা হয়, যা চৈত্র- সংক্রান্তি বা চৈত-পরব বলে খ্যাত। কৃষিজীবীদের জন্য চৈত্রমাস বিশেষ ক্রান্তিকাল। এ-বসন্ত যেন নীলাভ রৌদ্রদগ্ধ। তাই তারা তাদের শস্যাদি রক্ষায় বিচিত্র ব্রতাচারের মাধ্যমে নানাবিধ সমস্যার মোকাবিলা করে। খরা ও তাম্রাভ রৌদ্রদগ্ধ এ-মাসে বৃষ্টির আরাধনায় ব্যাঙাব্যাঙির বিয়ার প্রচলন রয়েছে। ব্যাঙাব্যাঙির বিয়েকে কেন্দ্র করে গিরস্তের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে নানা মাগনগীতও প্রচলিত। বিশেষ করে গিরস্ত ঘরের কুমারী মেয়েরা কুলা মাথায় দিয়ে বাড়ির উঠানে গীত গেয়ে বিয়ের জন্য এ-মাগন তুলে থাকে :

১. ব্যাঙাব্যাঙির বিয়া
ছাতা মাথাত দিয়া
ও ব্যাঙ মেঘ আনগা গিয়া…..।
খাল নাই পানি বিল নাই পানি
আসমান ভাঙিয়া পরে ছিডাছিডা পানি।
কানামেঘা-রে তুই আমার ভাই
একফুডা পানি দিলে শাইলের ভাত খাই….।
শাইলের ভাত খাইতে খাইতে
শইল অইল মুডা
কানা মেঘার ঘরঅ গিয়া ঠাস্যিয়া-ঠোস্যিয়া হামা

২. আল্লা মেঘ দে পানি দে
ছায়া দে রে তুই…..।

জমির ফসল রক্ষায় বন্দকুমারী (শক্তিদেবী) পূজা চৈত্র-সংক্রান্তির আগেই এ-মাসে সম্পন্ন হয়। সাপান্ত-শিলান্ত-বসন্ত এ-যেন চৈতের এ-সময়ের মহাদুর্যোগ। এসব থেকে রক্ষায় মন্ত্রসাধনের বিশ্বাস আজও আছে। সম্মিলিত প্রয়াসে প্রথা অনুযায়ী নতুন ধান কাটা ও নবান্ন গ্রহণে ‘আগ-লওয়া’ ও লক্ষ্মী ব্রত চৈত্র-সংক্রান্তিরই ধারাবাহিক পর্ব। এ-উপলক্ষ্যে বাড়ির আবহ রক্ষায় তুলসী গাছে ধারা বেঁধে পানি দেওয়ার প্রথাটি প্রচলিত আছে। পথে-ঘাটে গোবর ও বরুণ ফুলের ঘাটা বন্ধন। গোয়ালঘরে নিয়মিত ধোয়া দেওয়া। পূর্ব-পুরুষের শান্তি কামনায় গঙ্গাস্নান। ঘরের সাজসজ্জা বৃদ্ধি।

স্বাস্থ্যরক্ষায় নানাস্বাদের শাক-সবজি বিশেষ করে বিজ্ঞানে বিশেষভাবে উল্লেখিত ৪টি মৌলিক স্বাদ টক, মিষ্টি, নোনতা ও তিতা দিয়ে ব্রতের ভোগ প্রদানসহ খাবারের আয়োজন করা হয়। চৈত্র-সংক্রান্তিতে টক ও তিতা ব্যঞ্জন খেয়ে সম্পর্কে তিক্ততা ও অম্লতা দূরের প্রতীকী প্রথার প্রয়াস যে-কারণে এখনো বহাল আছে। এজন্য চৈত্র-সংক্রান্তিতে ‘আমডাল’ ও ‘গিমাই তিতা’ খাওয়ার প্রচলন গ্রামীণ বাঙালি আজও ধরে রেখেছেন। চৈত্র-সংক্রান্তির পূর্বে অবশ্য আম খাওয়া বারণ। এছাড়াও প্রকৃতি রক্ষায় নানা আচার-অনুষ্ঠান, যেমন, বাড়ির গাছপালায় বন্ধনি দেওয়াসহ নানা প্রথা প্রচলিত আছে। সর্বোপরি প্রতিটি পর্বকে কেন্দ্র করে গীত-গান ও ব্রত কথা তো রয়েছেই।

Charak Puja and Gajon: Acrobatic Skill to celebrate Chaita Sankranti; Image Source: Collected; Google Image

‘চড়ক’ চৈত্র-সংক্রান্তির একটি প্রধান উৎসব। চড়ক মেলায় অংশগ্রহণকারীরা শারীরিক কসরত প্রদর্শন করেন। শূলফোঁড়া, বানফোঁড়া, বড়শিগাঁথা ও আগুনে হাঁটা এ-উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ। তাছাড়া চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম আকর্ষণ হলো গাজন লোকউৎসব। পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার নাম যেমন, শিবের গাজন, নীলের গাজন ইত্যাদিতে কৃষক সমাজের একটি সনাতনী বিশ্বাস কাজ করে। চৈত্র-সংক্রান্তির সমাপনীর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় পরবর্তী উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ বা ‘বর্ষবরণ’। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাঙালি মেতে ওঠে অসাম্প্রদায়িক চেতনায়।

১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে মঙ্গল শোভাযাত্রা এ-উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক। কৃষিজীবী সমাজেও বর্ণিল রংয়ে সেজে আনন্দ-উল্লাসের প্রথা রয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় িএটি প্রতিফলিত। কৃষি সম্পদ গরুর যত্নসহকারে গোসল ও গায়ে নানা রংয়ের ‘হাদা’ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রামীণ জীবনে ফসল রক্ষায় জমিনে ‘বিশকাঠি’ স্থাপন পহেলা বৈশাখের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সাধারণত ‘খাগড়া’ দিয়ে এ-বিশকাঠি তৈরি হয়। নিয়মানুসারে খাগড়ার পাতা ভাঁজ করে গুটি বেঁধে কয়েকটি খাগড়ার মুষ্টি তৈরি করে জমিনে ও নদীতে নিশানের মতো পুঁতে রাখা হয়। কৃষিজীবীদের মাঝে যা শিলাবৃষ্টির রক্ষাকবজ বিবেচিত হয়ে থাকে।

বাঙালি খাবারের নানা আয়োজন হয় পিঠা-পায়েস, ছাতু খাওয়া, নতুন কাপড় পরিধান, মেলা, মৃতকারু পট শিল্পের আয়োজন, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, কুস্তিখেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, গান, সঙযাত্রা, যাত্রাপালা, কীর্তন, বায়াস্কোপ, সার্কাস ও হালখাতা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হালখাতায় মহাজনের লাল খাতার দেনা পরিশোধের রীতি আজো চালু আছে। নববর্ষের বিকালে গাঁয়ের মাঠে আয়োজিত ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতা ছোট-বড়ো সকলের মন কাড়ে। ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে রীতিমতো দলীয় প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। লড়াইয়ে যে-ষাঁড় জয়ী হয়, সেই দল সারা গাঁয়ে মিছিল করে জয় ও আনন্দের বার্তা প্রকাশ করে। স্লোগান দেয় :

জিত’রে ভাই জিত’ঙে
জিত্তিয়া আইলাম আড়ঙে।

Wrestling in Low Watery Land (Haor) of Bangladesh; Source: BBC News বাংলা YTC

গহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ফুটবল খেলাসহ দলে-দলে নানা ক্রীড়া নৈপুণ্যও প্রদর্শিত হয়। বিশেষ করে কুস্তি খেলায় বীরত্বের প্রতিভা সমাজের কাছে পুরুষত্বের অহংকার হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে একজন কুস্তিবীর মাঠে নানা শারীরিক কসরত প্রদর্শন করে অন্যজনকে (প্রতিপক্ষ) আহবান করে। দর্শক চারপাশে দাঁড়িয়ে তা দেখে। যে-মাল (বীর) খেলায় জয়ী হয় তাকে নিয়ে জাজম্যান (খেলা পরিচালক) ‘ডি.. ডি.. ডি. মাল’ বলে আওয়াজ তুলে মালের হাত ধরে মাঠ প্রদক্ষিণ করতে করতে পুনরায় অন্য মাল’কে খেলার আহব্বান করে। তারপর খেলতে খেলতে সর্বশেষ জয়ী মালকে বিজয়ী বলে পুরস্কৃত করা হয়। গিরস্ত বাড়ির কামলাগণ এ-খেলায় বেশি অংশগ্রহণ করে থাকে। তাই এ-বিজয় যেমন গিরস্তকে আনন্দ দেয়, তেমনি এলাকাজুড়ে মালের সম্মানও বৃদ্ধি করে। গ্রামীণ জীবনে বৈশাখি উৎসবের আয়োজন নগর জীবন থেকে আলাদা।

পান্তা-ইলিশ নাগরিক আচার মাত্র। গ্রামাঞ্চলে ঘরে-ঘরে দাওয়াত করে শাক-ভাত, দই-মাঠা, পিঠা-পায়েস খাওয়ানোর রেওয়াজ প্রচলিত। একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাড়ি-বাড়ি বেড়ানোর প্রথা এখনও গ্রামীণ জীবনে চোখে পড়ে। ছোট ছেলে-মেয়েরা বাড়ি-বাড়ি গিয়ে তারে লহর গেঁথে ‘পুরি (পুলিপিঠা) মাগা’-র প্রতিযোগিতামূলক উচ্ছাসের কমতি নেই। অভাবে-ধনে, জাতে ও বর্ণে আক্রান্ত মানুষগুলো স্বভাবে ও মননে উৎসবে এক হয়ে যায়। চৈত্র-সংক্রান্তি এবং ‘নববর্ষ’ পার্বণ বা পহেলা বৈশাখ তাই বাঙালি জীবনে অসাম্প্রদায়িক উৎসব। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও যা বাঙালি চেতনার অহংকার।
. . .

Pohela Boishakh; Bangla New Year History; Professor Shahnawaj; Source: Channel 24 YTC

. . .

লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *