দিনপঞ্জিকায় প্রতিটি মাসের পাতা জুড়ে ৩০/৩১ টি সংখ্যা থাকে। সংখ্যাগুলো একএকটি তারিখ বা দিনের নির্দেশনা দিয়ে থাকে। আমরা সেই তারিখমতো আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাই বা রুটিনমাফিক দিনযাপনে তারিখটি অতিবাহিত করি। কিন্তু, আমাদের জাতীয় জীবনে ক্যালেন্ডারের কিছু কিছু দিন বা তারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে আসে। অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল সেই দিন বা তারিখগুলো আমরা উদযাপন করি, যেমন—২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর, ১লা বৈশাখ, ৩০শে চৈত্র, ইত্যাদি। উল্লেখিত দিনগুলো আমাদের জাতিসত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, দিনগুলো স্বাধীনচেতা বীরবাঙালির পরিচয় বহন করে আবার আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ফুটে ওঠে।
পহেলা বৈশাখ উৎসবমুখর বাঙালির ঐতিহ্যে সমুজ্জ্বল। বৈশাখের উৎসব সর্বজনীন—এটা বাঙালির উৎসব। উৎসব প্রিয় বাঙালির পহেলা বৈশাখ একটি লোকায়ত উৎসব। নানান রকমের উৎসব আমাদের জাতীয় জীবনে জড়িয়ে আছে যেমন—পৌষ পার্বণ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি। তেমনি বাংলা নববর্ষ আমাদের আর্থ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের দাবীদার। বাংলাদেশের কৃষি নির্ভর আর্থ-সামাজিক কাঠামোর সাথে বাংলা দিনপঞ্জীর সম্পর্ক গভীর। এখনো এদেশের কৃষকরা বাংলা তারিখের হিসেবেই বীজ বোনে, ফসল কাটে। বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক তা নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। তবে বাংলা সন সৃষ্টির পেছনে দুইজন মুসলমান শাসকের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এদের একজন সুলতান হোসেন শাহ ও অন্যজন মোগল সম্রাট আকবর। তবে অধিকাংশের মতামত হলো মোগল সম্রাট আকবরই বাংলা সনের প্রধান প্রবর্তক।
বৈশাখের আগমনে বেজে উঠে নতুনের জয়গান। দুঃখ, জরা, ব্যর্থতা ও মলিনতাকে ভুলে সবাই জেগে ওঠে নব আনন্দে, নব উদ্যমে। ফসলি সন হিসেবে মোগল আমলে যে-বর্ষগণনার সূচনা হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ সমগ্র বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক স্মারক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের মাঝে বাঙালি খুঁজে পায় নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও চেতনার স্বরূপ। পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মবিকাশ ও বেড়ে ওঠার প্রেরণা। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুক্তিসাধনায় পহেলা বৈশাখ এক অবিনাশী শক্তি। বাংলা নববর্ষ বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উৎসব আনন্দে মেতে ওঠার দিন। আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড়ো গণমানুষের উৎসব। নববর্ষ সেজন্যই আমাদের আর্থসামাজিক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় বাঙালির ঐতিহ্যের অহংকার।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেকেও খ্রিস্টীয় সালের দিনক্ষণ মেনে চলতে হয়। তবুও বাঙালির ঐতিহ্যের শিকড়ে প্রোথিত বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম মহিমায় উজ্জ্বল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষই দেশের সর্বজনীন বড়ো উৎসব। নববর্ষের উৎসব আসে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। এমন সর্বজনীন উৎসব আর একটিও নেই। নানা মাত্রায় এটি সারাদেশে পালিত হয়। যা কিছু পুরোনো, যা কিছু জীর্ণ, তা পেছনে রেখে নতুনকে আমরা বরণ করি। আমরা নতুন করে শুরু করি। প্রকৃতিও নবরূপে সাজে। সবকিছু যেন আরও সবুজ হয়ে ওঠে। গাছে গাছে নতুন পাতা, ফুলের সমারোহ আর পাখির কণ্ঠে গান যেন উৎসবে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়। দোকানে দোকানে হালখাতা অনুষ্ঠান হয়, গ্রামের পথে-প্রান্তরে মেলা বসে। বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখ আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহক হলেও, জীবন আর জীবিকার তাগিদে গ্রামের মানুষ একসময়ে উঠে আসে শহরে, সঙ্গে নিয়ে আসে সংস্কৃতির নানান অনুসঙ্গ। পহেলা বৈশাখের সাংস্কৃতিক আয়োজন এভাবেই গ্রামীণ মানুষের হাত ধরে শহরে চলে আসে। বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি উৎসবমুখর বাঙালির ঐতিহ্যের স্মারক।

উৎসবমুখর বাঙালির প্রতিটি পার্বণ নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র কবিতা গান। বাংলা কবিতা ও গানে বারবার উঠে এসেছে ষড়ঋতুর রূপ বৈচিত্র্য। বাংলা সাহিত্যে এমন কোনো কবি নেই, যিনি বৈশাখ নিয়ে কবিতা লেখেননি কিংবা যাদের কবিতায় বৈশাখের রূপ উঠে আসেনি। বাংলা কবিতায় নববর্ষ যেভাবে, যত বহুমাত্রিকতায় এসেছে, তা অন্য কোনো জাতির নববর্ষে আসেনি। পহেলা বৈশাখের ভোরে আলো ফোটার আগেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটি আজ বাঙালির ঐতিহ্যের রূপ পরিগ্রহ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি যেন বাঙালির মননে জানান দিয়ে যায়—আজ পহেলা বৈশাখ। বৈশাখকে আবাহন করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের এই গানটি যেন বাঙালির হৃদয় থেকে উৎসারিত। রবীন্দ্রনাথের সেই আবেগতাড়িত বিবেক জাগানিয়া গানটি এখানে উৎকলন করছি :
এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গান ‘এসো হে বৈশাখ’ পুরোনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও দুঃখ মুছে ফেলে নতুনের আহবানের এক শৈল্পিক ও দার্শনিক আবাহন। এই গানে বৈশাখকে রুদ্র ও প্রলয়ঙ্কারী রূপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা আগুনের স্নানে ধরণীকে পবিত্র করে নতুন আশা ও শক্তির সঞ্চার করবে। এটি শুধু নববর্ষের গান নয়, জীবনের ক্লান্তি দূর করে নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
কবি বৈশাখকে বলছেন, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’। অর্থাৎ, গত বছরের হতাশা, রোগ, শোক ও জরাজীর্ণতা যেন নির্বাসিত হয়—জীবনের অধ্যয় থেকে। ‘অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’—বৈশাখের প্রচণ্ড খরতাপ বা কালবৈশাখীর ঝড় যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত আবর্জনা ও অশুভ শক্তি দূর করে ধরণীকে পবিত্র করে তোলে। ‘আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ’—পুরোনো, মৃতপ্রায় বা ‘মুমূর্ষু’ অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে নতুন কিছু গড়ার জন্য ধ্বংসের (প্রলয়) প্রয়োজন, যা বৈশাখ নিয়ে আসে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখকে ‘তাপস’ বা কঠোর সাধক হিসেবে কল্পনা করেছেন। তার এই রূপ যেমন রুদ্র (ভয়ংকর), তেমনই মোহন (আকর্ষণীয়)। রবীন্দ্রনাথের গানটি এখন বাঙালির নববর্ষ উদ্যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত করে। এই গানটি ভাঙনের মধ্য দিয়ে গড়ার, ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির এবং পুরোনোকে পেছনে ফেলে নতুনের সাথে নতুনভাবে পথচলার গান।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানেও বৈশাখের রুদ্ররূপ উঠে এসেছে। কবির বিখ্যাত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটি নজরুল সঙ্গীত বা দেশাত্মবোধক গান হিসেবেও পরিচিত। এই কবিতাটি ধ্বংস ও নতুন সৃষ্টির আনন্দে কালবৈশাখীর ঝড়ের মাধ্যমে পুরোনো জরাজীর্ণতাকে ভেঙে ফেলার আহবান জানায়। কালবৈশাখীর কাল্পনিক রূপ ধরে প্রলয়ঙ্করী শক্তির আগমনে পুরোনো, অন্যায্য ও জরাজীর্ণ সমাজ ভেঙে পড়ে এবং নতুন যুগের সূচনা হয়। কবি এই ধ্বংসযজ্ঞকে ভয় না পেয়ে উল্লাসের সাথে স্বাগত জানাতে বলেছেন। মূলত, নজরুল এই কবিতাটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে লিখেছিলেন, যেখানে ‘প্রলয়’ বলতে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিপ্লবের মাধ্যমে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক বোঝানো হয়েছে। কবিতা/গানটির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি :
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঐনূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
আস্ল এবার অনাগত প্রলয়–নেশায় নৃত্য–পাগল,
সিন্ধু–পারের সিংহ–দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!
মৃত্যু–গহন অন্ধকুপে, মহাকালের চন্ড–রূপে ধূম্র–ধূপে
বজ্র–শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!
ওরে ওই হাসছে ভয়ংকর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
কবিতাটি মূলত তরুণ সমাজকে অন্যায় ও ভয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং নতুন সমাজ গড়ার প্রেরণা দেয়।
জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি, যিনি রূপসী বাংলার কবি বা প্রকৃতির কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাঁর কবিতায় বাংলার চিরায়ত নিসর্গ, নদী, ধানক্ষেত, কাশফুল এবং বিষণ্ন সৌন্দর্যের এক অনন্য চিত্রকল্প ফুটে ওঠে, যা পাঠককে মুগ্ধ করে। তিনি প্রকৃতির ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ তুলে ধরেছেন কবিতার পঙক্তিতে। বাঙালির বৈশাখ মাসটি জীবনানন্দের কবিতায় উঠে এসেছে এক অনন্য নান্দনিকতায়। জীবনানন্দ দাশের বৈশাখ বা নববর্ষ নিয়ে লেখা অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো বর্ষ আবাহন। এই কবিতায় তিনি পুরাতন বছরের জীর্ণতা মুছে ফেলে নতুন বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন, যেখানে প্রকৃতির স্বচ্ছ রূপ এবং নতুনের বার্তা সুস্পষ্ট। এছাড়া, তিনি বৈশাখের ধ্বংসের পাশাপাশি সৃষ্টির উল্লাসকেও তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনানন্দ দাশের বর্ষ আবাহন কবিতাটি এখানে উৎকলন করছি :
ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে
দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে
প্রভাত রবি উঠল জেগে
দিব্য পরশ পেয়ে,
নাই গগনে মেঘের ছায়া
যেন স্বচ্ছ স্বৰ্গকায়া
ভুবন ভরা মুক্ত মায়া
মুগ্ধ-হৃদয় চেয়ে।
অতীত নিশি গেছে চলে
চিরবিদায় বার্তা ব’লে,
কোন্ আঁধারের গভীর তলে
রেখে স্মৃতিলেখা,
এসো এসো ওগো নবীন,
চলে গেছে। জীৰ্ণ মলিন—
আজকে তুমি মৃত্যুবিহীন
মুক্ত সীমারেখা।
জীবনানন্দ দাশের আরেকটি কবিতায় বৈশাখী রাতের পরিবেশ ও বাতাসের স্পর্শ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ মানেই প্রচণ্ড দাবদাহের পরে কালবৈশাখীর রূপ, সোনালি রোদের ঢেউ এবং প্রকৃতির নতুন সাজ। বৈশাখকে তিনি দেখেছেন শুভ্রতার প্রতীক, মেঘের ভেলা আর সাদা কড়ির মিলন। জীবনানন্দ দাশের ‘ঘুমিয়ে পড়ব আমি’ কবিতায় সেই স্বরটি আমরা শুনতে পাই এভাবে :
ঘুমিয়ে পড়ব আমি একদিন তোমাদের নক্ষত্রের রাতে
শিয়রে বৈশাখ মেঘ সাদা যেন কড়ি শঙ্খের পাহাড়।
জীবনানন্দ দাশের বৈশাখের কবিতাগুলোতে সাধারণত প্রকৃতির রূপ বদলের সাথে সাথে মানুষের জীবনের নতুনের প্রতি আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।
ষাটের দশকের কবিতায়, বাংলাদেশের কবিতায় একটি স্পষ্ট পালাবদলের কাজ চলেছিল, যার ভিত্তি রচনায় শামসুর রাহমানের অবদান ছিল সর্বাধিক। শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যে কবিতার রাজ্যে আধুনিকতার প্রতীক, যিনি নববর্ষের আনন্দ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তাঁর রচিত নববর্ষ বা বৈশাখ নিয়ে লেখা কবিতাগুলোতে পুরোনো বছরের হতাশা ভুলে নতুন আশা, তেজ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটে। শামসুর রাহমানের ‘এলো নববর্ষ, শুভ নববর্ষ’ কবিতা—উৎসবের সুর নিয়ে আসে। শামসুর রাহমানের কবিতায় নববর্ষের চেতনা জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নতুন আশা ও স্বপ্নের উদয় ঘটে। তাঁর অনেক কবিতার মতোই নববর্ষের লেখাতেও অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ফুটে ওঠে। তবে, শামসুর রাহমানের নির্দিষ্ট কোনো একটি ‘নববর্ষের কবিতা’র চেয়ে তার সামগ্রিক কাব্যধারায় নববর্ষ ও বৈশাখ নতুন উদ্দীপনার বার্তা বহন করে। তাঁর কবিতায় বৈশাখের রূপ ফুটে উঠে এভাবে :
রাত্রি ফুরালে জ্বলে ওঠে দিন
বাঘের থাবায় মরছে হরিণ
কাল বোশেখের তাণ্ডবে কাঁপে পড়ো পড়ো চাল
শূন্য ভাঁড়ারে বাড়ন্ত চাল
—ইচ্ছে তাঁর ইচ্ছে।
আমরা আরও অবলোকন করি, শামসুর রাহমান বৈশাখকে কবিতায় তুলে এনেছেন এভাবেই :
আকাশের তুলট কাগজে কী সহজে
বৈশাখ স্পষ্ট লেখে প্রথম অক্ষর,
যেন আদি কবির খাগের কলমের
ডগা থেকে ঝরে আদি শ্লোক নতুনের
খবর রটিয়ে চরাচরে।…

আল মাহমুদের কবিতায় নববর্ষ বা বৈশাখ জরাজীর্ণতাকে ভেঙে নতুন প্রাণের উল্লাস বয়ে আনে। আল মাহমুদের কবিতায় বৈশাখী ঝড় শুধু ধ্বংস নয়, বরং নতুন সৃষ্টির মহাগুঞ্জন জাগায়। প্রসঙ্গত, আল মাহমুদের কালবোশেখী কবিতাটি এখানে উৎকলন করছি :
কোথায় যাব কোথায় বাড়ি কোথায় হবে শেষ
ঝড়ের বাতাস টানছে আমায় টানছে নিরুদ্দেশ
উড়িয়ে নিল বসন, শাড়ি আঁচল উড়ে যায়
হাত বাড়ালেই ধরতে পারি দক্ষিণা হাওয়ায়
আঁচলখানি ধরি যদি ধরতে তো চায় মন
ঝড়ের বাতাস পাতা উড়ায়, ঝড়ের আয়োজন
পা বাড়িয়ে পথে নামি পথের কী শেষ আছে
গাছের ডালে বসছে পাখি শব্দ গাছে গাছে
কালবোশেখী ঝিলিক মারে কালো মেঘের সাজ
শরম নাই লো ও যুবতী নাই বুঝি তোর লাজ
ঘোমটাখানি দিলাম তুলে সিঁথির ’পরে টান
ঝড়ের সাথে খড়ের কুটো আনছে ডেকে বান
ওড়ার মাঝে জোড়ার পাখি খুঁজছে সাথী তার
কোথায় সাথী কালো রাতি নামল কী আঁধার!
তাঁর কবিতায় ‘কালবোশেখী’র সাথে গ্রামীণ জীবনের একাত্মতা এবং উৎসবের আমেজও ফুটে ওঠে। গ্রামীণ জীবনে পহেলা বৈশাখ শুধুমাত্র উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসে না, বরং জীবনের প্রাপ্তি /অর্জনের খেরোখাতা খুলে দেয়। মহাজনের সম্পদ নির্মাণে খাজাঞ্চিবাবুর শ্রম-ঘামের মূল্যায়ন আছে কি! এমন ব্যতিক্রম সমীকরণ নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণের বৈশাখের কবিতা ‘খাজাঞ্চিবাবুর নববর্ষ’। এখানে কবিতাটি উৎকলন করছি :
দেখতে দেখতে আরো একটি চৈত্র প্রায় শেষ হলো, আজ সংক্রান্তি, কাল থেকে বৈশাখের শুরু।
খেরো-খাতার হিসেবের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ভাবছেন খাজাঞ্চিবাবু—এরই মধ্যে নাকের ডগায় ঝোলা
সুতো বাঁধা চশমার লেন্স বদলাতে হলো বার তিনেক।
তবু তার হিসেব মিলছে না—শুধু দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে বারবার।
এদিকে উদ্বিগ্ন মহাজন সতর্ক’ ভ্রুকুটি হেনে আছেন তাকিয়ে,
যেন একজোড়া আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র,
কখন আঘাত হানবে কে জানে?
খাজাঞ্চিবাবু ভাবেন আজ এই সংক্রান্তির পুণ্য-রজনীতে
মহাজন গদিতে যদি তার মৃত্যু হয়, তাও ভালো। বিবাহযোগ্যা দুই মেয়ে সুজল-সুফলা আর নাবালক দুই পুত্র যদু-মধুকে নিয়ে বিধবা হবেন স্ত্রী অন্নপূর্ণা। আমার কী? আমি দিব্যি বৈতরণী পাড়ি দিয়ে চ’লে যাবো
ঈশ্বরের নিজের মোকামে, তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সহায় সম্পদের
হিসেব মিলাবো অন্য এক খেরো-খাতায়।
আর ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন হয় চিত্রগুপ্তের কাজটাই যাবো পেয়ে,
এক দু’বছর তো নয়, দীর্ঘ দু’শ পঁয়ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতা।
( সংক্ষিপ্ত)
নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় নববর্ষ কেবল উৎসবের রং নয়, বরং গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর ‘খাজাঞ্চিবাবুর নববর্ষ ‘কবিতায় বৈশাখী উৎসবের আড়ালে মহাজনের হিসেব-নিকেশ ও সাধারণ মানুষের হতাশা আর আক্ষেপের চিত্র ফুটে উঠেছে। নতুন বছরের নতুন আশার চেয়েও খাজাঞ্চিবাবুর ঘানিটানা জীবনের দীর্ঘশ্বাসমাখা কাহিনি এখানে বিধৃত হয়েছে। ‘খাজাঞ্চিবাবুর নববর্ষ’ কবিতায় বৈশাখের হালখাতা ও চৈত্রসংক্রান্তির জরাজীর্ণ হিসাবের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের বাস্তব দৃশ্য তুলে ধরেছেন। বৈশাখ যেমন উৎসব, তেমনি জীবনের খতিয়ান মেলানোর সময়ও বটে!
বাঙালির গানে-কবিতায় বাংলার নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ বহুবর্ণিল, কবিদের কাব্য সুষমায় বৈশাখের রূপ ফুটে উঠেছে নানান মাত্রায়। আবহমান বাংলার ষড়ঋতুর রূপ বৈচিত্র্যে মুগ্ধ বাঙালি কবি। তাই, তাঁদের কাব্যের উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্পে ষড়ঋতুর রূপ-লাবণ্য ফুটে ওঠে, সেইসূত্রে বৈশাখের রূপ বৈচিত্র্যও চিত্রিত হয় কবিতায়—গানে। বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অনুষঙ্গ বাংলা বর্ষবরণ উৎসব। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্ভাসিত বর্ষবরণ উৎসবে বাঙালি খুঁজে পায় তার শিকড়ের সন্ধান। তাই, বাঙালির বর্ষবরণ—গানে ও কবিতায় মুখরিত।
. . .

সংযুক্তি
বাঙালির বৈশাখ উদযাপনের হালখাতা কেন্দ্রিক চিরায়ত গ্রামীণ রূপে সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শাহরিক অনুষঙ্গও। রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা ও কন্সার্ট, আর বর্ণিল বাহারে দেশের শহরগুলোয় জনস্রোতের সাংস্কৃতিক বিস্ফার একটা সময় আমরা দেখেছি। দেশে ধর্মান্ধতার বিপুল উত্থান ও সাল পয়লা নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এই বিস্ফারকে অনেকখানি নিস্তেজ করে দিয়েছে। তা-সত্ত্বেও বৈশাখ বাঙালির সর্বপ্রধান সর্বজনীন উৎসব।
কৃষিপ্রধান বাংলায় গ্রামীণ হালখাতাকে কেন্দ্র করে বর্ষবরণের মূল লোকাচারের সঙ্গে নাগরিক পরিসরে উদযাপিত আয়োজনের ফারাক আছে নিঃসন্দেহে। যদিও, বর্ষবরণের মতো উৎসবে নতুন অনুষঙ্গ যোগ হওয়াতে ‘গেল গেল..’ রব তোলা বা একে খারাপ ভাবার কিছু নেই। নতুন অনুষঙ্গ যোগ হওয়া মানেই সর্বনাশ ভাবাটাও একধরণের কূপমণ্ডূকতা। সংস্কৃতি কখনো রক্ষণশীলতায় সজীব থাকে না। সে বাঁচে ও নবপুষ্পে বিকশিত হয় নতুন সংযোজন ও স্বতঃস্ফূর্ত বৈচিত্র্যে। এখানে রক্ষণশীলতা বা জোর করে রুখতে গেলে বরং তার স্রোত মরে যায়।
রবি ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষবরণ কেন্দ্রিক গান ও কবিতা দেশে নাগরিক বৈশাখ উদযাপনকে মাত্রা দিয়েছিল। এই ধারায় বাংলাদেশের ব্যন্ড সংগীতের অন্যতম কাণ্ডারি ফিডব্যাকের ‘মেলায় যাইরে’ গানটি ছিল নতুন সংযোজন। তরুণ প্রজন্মের কাছে গানটির আবেদন একটা সময় অনিবার্য থেকেছে। নগর পরিসরে বাংলা বর্ষবরণের রং-রস ও দেশি-বিদেশি সংস্কৃতির পারস্পরিক অনুপ্রেবশকে ফিডব্যাক ফুটিয়ে তুলেছিল গানের ভাষা ও সুরে। হ্যাঁ, গানের চলনে বৈশাখের নিখাদ বাঙালিয়ানা উদযাপনে নাগরিক সমাজের বিচ্যুতি নিয়ে চাপা বিদ্রুপ আছে বটে, কিন্তু একে উপেক্ষাও করছে তা। মেতে উঠতে চাইছে অনাবিল উচ্ছাসে।
যাইহোক, ‘মেলায় যাইরে’ গানটির আবেদন ম্লান হওয়া আভাস দিয়ে যায়, আজকের তরুণ প্রজন্ম বাঙালির চিরায়ত সর্বজনীন উৎসবগুলো থেকে দুঃখজনকভাবে সরে যাচ্ছে। অন্ধকারগামী এক ট্রেনে চড়ে বসেছে গোটা দেশ। যারা এখন আর স্মৃতিকাতর নয় বৈশাখের মতো সর্বজনীন উৎসবের মেতে ওঠার আবেশে। সেখানে হানা দিয়েছে অপশক্তি ও কূপমণ্ডূকতা। কূয়োর ব্যাং হওয়ার মধ্যে বাঙালি খুঁজছে চরিতার্থতা নিজের! আফসোস।
দুখী নিরানন্দ জনপদে ধর্মীয় ও এরকম জাতীয় উৎসবগুলো একমাত্র, মানুষকে ক্ষণিক হলেও মাতিয়ে রাখে। পেরেশানি ভুলে আনন্দে মেতে উঠতে প্রেরণা দিয়ে যায়। সুতরাং, বৈশাখকে উপেক্ষা করা মানে রংহীন জীবনকে মেনে নেওয়া স্বেচ্ছায়। কাঠমোল্লার চোখ রাঙানির কাছে নতজানু হতে থাকা বারবার। তো এখান থেকে বৈশাখকে অগ্রিম স্বাগতম। স্বাগত ফিডব্যাকের এই আহবান :
লেগেছে রমণীর খোঁপাতে
বেলী ফুলের মালা
বিদেশি সুগন্ধি মেখে আজ
প্রেমের কথা বলা
রমনা বটমুলে গান থেমে গেলে
প্রখর রোদে এ যেন মিছিল চলে
ঢাকার রাজপথে রঙের মেলায়
এ বুঝি বৈশাখ এলো বলেই
. . .

লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .


