পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

বান্দিপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

Reading time 12 minute
5
(30)

গিরস্তের পুত
বর্ষায় কুতকুত, হেমন্তে জোত
আর যতসব নাইকামের ছুঁত।

Artwork: Torned String by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

পুত আর জোত ভাটির গিরস্তের অমূল্য সম্পদ। কেননা উঠোন থেকে জোত-জমি পর্যন্তই থাকে গিরস্তকুলের স্বপ্নের সিঁড়ি। পুত আর জোত তাদের কাছে হীরা-মাণিক্যি। এককালে নেহায়াত জীবন-মরণ কারণ ছাড়া উঠোন-জমিনের বাইরে গিয়ে ভাটি-ময়ালে কারও স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, স্বর্গবাসী হওয়ার খায়েশ করেনি কেউ। আর, পাঠশালা কিংবা পুঁথিবিদ্যা অর্জন? তা কেবল কর্মহীন সন্ধ্যায় কুপি বাতির আলোয় কেরোসিনের সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের মেঝেয় বিছানো ছালার চটে বসে বাল্যশিক্ষায় ক্ষান্তি দিয়েছে। নাম-দস্তখত লেখা, চিঠিপত্র পড়া, জোত-জমির মাপজোক আর খাজনার হিসাব-নিকাশ জানলেওয়ালারা একসময় তাই ভাটি-ময়ালের বিদ্যাসাগর ছিল।

১৯৮১ খ্রিস্টাব্দ। বাল্যশিক্ষা শেষ করে আমি আমার অবুঝ মায়ের কান্দনে মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের বাসনায় জন্মভিটা ভাটির গিরস্ত-ময়াল ছেড়ে কিছু উজানে লজিংবাড়ি যাই। লজিংবাড়িটি উজান এলাকায় ‘চৌধুরী বাড়ি’ নামে পরিচিত। বেশ নামডাক আছে তার। চৌধুরী যদিও তখন থেকে অনেক আগে বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে গেছেন। তারপরও বাড়িতে দাসী-বান্দি নিয়ে লতাগোষ্ঠী এখনও পরে আছে মাটির মায়া কামড়ে। লম্বা-লম্বা চৌহর্দি (*বাড়ির ভিটার চারপাশে ঘেরা) টিনের ঘর, আর স্বাদু মাছের পুকুরপাড়ে জোনাকজ্বলা লেবুবাগান, আমতলা, জামতলা, কাঁঠালতলা… আরও কত কী!

চৌধুরী বাড়ির ঐতিহ্যের পর্দা এখন অনেকখানি মলিন হয়ে গেছে। এই বাড়িতে আমার পিতামহ তার একমাত্র কন্যা সবেধন নীলমণি অর্থাৎ আমার একমাত্র পিসিমণিকে বিয়ে দিয়েছিলেন। আর, এই আত্মীয়তার সুবাদে পুঁথিবিদ্যা শেখার জন্য হাইস্কুলে পাঠগ্রহণের সুযোগ হয়। মায়ের কান্দন যেমন-তেমন, পিসিমণিরও এই ইচ্ছা ছিল-যে, আমি এখানে থেকে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করি। পিসিমণির বাড়ি আমার লজিংবাড়ি হয়ে ওঠে। জংধরা মরিচাপরা চৌধুরী বাড়ির টিনের ঘরে শালকাঠের চৌকাঠে আয়েশে শিকার করে বেঁধে রাখা বুনো হরিণের শিংওয়ালা মাথা, আর হাট থেকে একটাকায় কেনা দাসী-বান্দির জৌলুস এখনও এ-বাড়ির অতীত বিলাস-বিলাসিতার সাক্ষী হয়ে আছে।

আমি তখন মাধ্যমিক পড়ুয়া গিরস্তের পুত। দাসী-বান্দি বোঝার আক্কেল হয়নি তখনও। দাসী-বান্দি সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি ও বুঝেছি, তা কেবল চৌধুরী বাড়ি আসার সুবাদে পিসিমণির মুখ থেকে শোনা। পিসিমণি শুধু একটি কথা বলতেন : ‘বড়ো হও বাবা, তখন বুঝবে’। পিসিমণি ছিলেন জৌলুসের টান ভাটার দিকে নামতে থাকা চৌধুরী বাড়ির বড়োবউ। দাসী-বান্দিদের সেই জৌলসী জোয়ার, সেই জামানা তখন আর নেই; কিন্তু, চৌধুরী বাড়িতে আগেকার যুগের বান্দিরা ঠিকই ছিল। বাড়ির বারামখানা বা অন্দরমহল ছেড়ে স্বপরিচয়ে লোকসমাজে তারা ততদিনে জায়গা করে নিয়েছে। স্বাভাবিক জীবনধারায় প্রবেশ ঘটেছে তাদের। এর মূল কারণ ছিল চৌধুরী বাড়ির আর্থিক দুরাবস্থা। এছাড়াও, অহেতুক বান্দি খাটানোর মনোবৃত্তি আমার পিসিমণির ছিল না। এর ফলে চৌধুরী বাড়ির বান্দিকুল মনুষ্যকুল হিসেবে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ওঠবস করছে।

যাইহোক, মূল কথায় আসি, আমি তখন জানতে পারি বান্দি চৌধুরী বাড়ির লতাগোষ্ঠীর কেউ নয়, —আগন্তক মাত্র। নিজের কথাও ভাবতাম তখন। তফাত খুঁজতাম মনে-মনে! এখানে কেউ চৌধুরী বাড়ির কুটুম, আর কেউ হলো কামলি। এসব ভেবে মনে কষ্ট জমা হতো। চৌধুরী বাড়ির বান্দিকে আমি তখন পিসি নামে ডাকছি। মাঝেমধ্যে রাগ হলে বড়োদের শিখানো বুলি ধার চেয়ে ‘বান্দিপিসি’ নামে তাকে ডাকতাম। বান্দিদের অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার বয়স আমার হয়নি। স্বাভাবিক খেয়ালে তবু প্রশ্ন জাগছিল মনে : তাদের আসল পরিচয় কী? তারাও কি আমার মতো কোনোকিছুর দায় নিয়ে এ-বাড়িতে পরবাসী হয়ে আছে? আমার মতো তারাও কি লজিং থাকে? আমার সাথে তফাত কোনখানে? আর, এসব কথা ভাবার কারণ এই-যে,—আমাদের বাড়িতেও গিরস্তালি কাজের খাতিরে অনেককে জাগির (*জায়গির বা কোনো একটা কাজ সম্পাদনের চুক্তিতে আশ্রিত) থাকতে ও কাজ করতে দেখেছি। যারা তাদের প্রয়োজনে আশ্রয় নিয়েছে ও কাজ করেছে, আবার প্রয়োজন ফুরানোর পর চলেও গিয়েছে।

Artwork: Unnamed by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

একসময় বয়স বাড়ার সাথে-সাথে আমার বান্দি নিয়ে ভুল ভাঙলো। তখন আমি লজিংবাড়ি ছাড়লাম; কিন্তু বান্দিরা চৌধুরী বাড়ি ছাড়েনি, আর তাদের মনুষ্যত্ববোধ ওদিকে আমাকে ছাড়েনি। তাই শুধু কৌতুহল নয়! ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’ : কেবল এই কথাটা বান্দিপিসিকে বলব বলে মাঝে-মঝে চৌধুরী বাড়িতে পা রেখেছি পরে। এভাবে ‘আমরা সবাই রাজ ‘ বলতে-বলতে ওরা স্বাধীন হয় একসময়। শুরু হয় সম্পত্তির অধিকার নিয়ে তাদের আলাদা ঘরসংসার। বান্দিপ্রথার আদিঅন্ত জানার আগ্রহে তখন থেকে ভাটি-ময়ালে আমার ঘোরাঘুরির শুরু। বেরিয়ে আসে তৎকালীন সমাজে বান্দি বানানোর নিমিত্তে মানুষ কেনা-বেচার নানা তথ্য। বান্দিকুল নিয়ে কোমর বেঁধে ঘাঁটাঘাঁটি খাটাখাটি করে পাওয়া কিছু খণ্ডতথ্য ও তত্ত্বের লেখ্যচিত্র… যা প্রায় দুই কুড়ি বছর পর আজ তুলে ধরছি। শুধু তাই নয়, ভাটির ময়ালে গিরস্তবাড়িতে বান্দি প্রথার বাস্তব চিত্রের শেষদৃশ্যও দেখেছি;—শুনেছি তার গল্প অনেক। আজকের মূল বিষয় হলো বান্দি নামে সমাজে পরিচিত নারীদের জীবনবোধের আড়ালে লেখা হতে থাকা গল্প ও বাস্তবতার আংশিক সমাচার তুলে ধরা।

ভাটির ময়ালে ‘মায়ারাণী’ নামে এক বান্দি ছিলেন। তিনি ব্রাহ্মণের মেয়ে। সামাজিক মর্যাদা চিস্তা করে তার আসল নাম-সাকিন বলছি না এখানে। তিনআনা যৌতুক দিতে না পেরে সময়মতো বিয়েশাদি হয়নি তার। বিবাহের সামাজিক বিধানে অপয়া দোষে দোষী মায়ারাণী ব্রাহ্মণ সভ্যকুল বা পিতার আশ্রয় ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ভাটির অচিনগাঁয়ের বান্দিকুল হয়ে দাঁড়ায় তার বেঁচে থাকার খোঁয়াড়। সেই খোঁয়াড়ে মায়ারাণী কেমন ছিলেন? খোঁয়াড়বন্দি বান্দির জীবনাচার লিখতে বসে আমার হৃদয় নাড়া দিয়ে ওঠে। বিবেকের কষ্ট-সরোবরের তীরে ঢেউ আঁছড়ে পড়ে। আঘাত হারে ঢেউ। বেদনার সুর বহে বুকে। কাতর হয়ে বিলাপের সুরে লিখে ফেলি ‘বান্দিপুরাণ’ :

শোন শোন বান্দিপুরাণ দুঃখেরও বয়ান
শুনিলে কান্দিয়া উঠে জমিন-আসমান\

কি বলিব বান্দিপুরাণ ভাষা নাই মুখেতে
রাজবাড়ির বান্দিমহল পারি নাই দেখিতে\

রাজমহলে ফোঁটে কমল কেন বান্দির হাতে
রাজার কেন বান্দিবিলাস রাজরানী থাকিতে\

বান্দির পেটে হয় সন্তান কাহার বরেতে
বান্দিপুত্র রাজত্ব পায় কোন বিধি মতে\

বান্দির পেটে জন্মে পণ্ডিত কীসের বলেতে
রানী কেন মূর্খ বিয়ায় রাজঔরস থাকিতে\

কেবা বান্দি কেবা রানী না পারি বুঝিতে
রাজমহলে বান্দি যারা থাকে যে সুখেতে\

রাজমহলের বান্দিকথা চাই না যে বলিতে
তারা থাকে পরম সুখে রাজারও হালতে\

কোথা হতে আসে বান্দি জন্ম কোন কুলেতে
ভাটির দেশে গিরস্তবান্দি আসে কোথা হতে\

বান্দিজীবন আছে কেমন ভাটির দেশেতে
ব্রাহ্মণ কন্যা বান্দি কেন গিরস্ত বাড়িতে\

দুনিয়াতে সভ্যতা বিকাশের ফলে দাস-দাসী বা বান্দি-গোলাম প্রথার উদ্ভব হয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে, ক্রয়সূত্রে, সামাজিক বিধান ও গৃহস্থালির প্রয়োজন-সহ নানা কারণে নানাভাবে প্রথাটি শুরু হয়। রয়েছে এর নানা ক্ষেত্র। এ-ক্ষেত্রে কান টানলে যেমন মাথা আসে, তেমনি দাসী-বান্দির কথা উঠলে রাজমহল চলে আসে। রাজা-রানীর অন্দরমহল চলে আসে। তবে ধর্মমহলের চরণদাস কিংবা চরণদাসীর বিষয়টি এখানে ভিন্ন। আরও ভিন্ন হলো ভাটি ময়ালের গিরস্তগৃহে বন্দি বান্দিকুলের কথা। আজকের বিষয় আমার শৈশবের স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া দক্ষিণ ভাটিগাঁয়ের বেতাল পরগনার ব্রাহ্মণের মেয়ে মায়ারাণীর বান্দিজীবনসহ এ-যাবৎকালে জানা ভাটি ময়ালের গিরস্ত বান্দিসমাচার :

Photography: Wedding Ritual by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.con

ব্রাহ্মণের মেয়ে মায়ারাণী। তিনি তার পিতার নয় সস্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। পুত্র সন্তান নেই। তবে স্বর্গ প্রাপ্তির আশায় পুত্র লাভের আকাঙক্ষা ব্রাহ্মণের এখনও আছে। এ-নিয়ে সমাজে ব্রাহ্মণীর নিন্দার শেষ নেই। বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়েছে একবছর আগে অতিবয়ষ্ক ‘দ্বিত্তাব্বর’ পাত্রের সাথে। এ-বিয়ের ঋণ পরিশোধে সুদে-আসল খাতায় হিসাব করে ব্রাহ্মণের বসতভিটা কবজার ফাঁদ পেতে বসে আছে মহাজন। এবার দ্বিতীয় মেয়ে মায়ারাণীর বিয়ের পালা। সমাজে প্রচলিত ‘রোহিণী বিবাহ প্রথা’ অনুসারে এখন বিবাহ না হলে আর তিন মাস পরে দশ বছরে পা দেওয়ার কারণে ‘অপয়া’ হবে মায়ারাণী।

ব্রাহ্মণ চিন্তিত! কিন্তু প্রতি বছর স্ববর্ণে ও স্ববংশে কন্যাদান ব্রাহ্মণের কাছে উঠানসমুদ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ক্ষুধার্ত পেট এখন আর পূজার নৈবদ্য, দক্ষিণা বা জজমানিতে ভরে না। ঈশ্বরের কৃপায় মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে বেঁচে থাকার পথ নেই। বছর-বছর ফসলহানিতে ভাটির ময়ালে অভাব দেখা দেওয়ায় ব্রাহ্মণ সেবার মাহাত্ম্য দেবালয় ছেড়েছে। লোকালয়ে ব্রহ্মত্ব বোঝানোর জন্য পৈতা কানে ঝুলিয়ে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। এ-অবস্থায় কন্যাদান যেন আপদ বিদায়।

১৩৫০ বাংলা। দারুণ অভাব-অনটনে দিন যায় ব্রাহ্মণের। বিয়ে-থা নিয়ে ময়ালে সকল মেয়ের বাপেরা এখন বিপাকে আছেন। আর জোত-জমিহীন ব্রাহ্মণের এখন অন্নযুদ্ধ বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠোঙা ভরে ভোগ-নৈবদ্য বা দক্ষিণা দিয়ে কেউ এখন আর ময়ালে পূজা দেয় না। পূজা হয় কেবল ধান-দূর্বা আর তিল-তুলসী দিয়ে। ব্রাহ্মণসমাজ নিরুপায়। মন্ত্রগুণের জামানা ফুরিয়ে আসছে। পৈতার জলে আর কারও চিত্ত শুদ্ধ হয় না।

দরিদ্র এক ব্রাহ্মণ ছিল দক্ষিণ ভাটিগাঁয়
কি বলিব তাহার কথা সহনও না যায়\

ব্রাহ্মণীরে লইয়া গৃহে শাক-অন্নে দিন যায়
ব্রাহ্মণী উপোস করে ব্রাহ্মণরে খাওয়ায়\

জজমানিতে যোগায় অন্নকড়ি দক্ষিণায়
ন’জন তার শ্রীকন্যা হয় পুত্র নাহি পায়\

অন্নদাতা বিধাতা আর গোবিন্দের কৃপায়
গোবিন্দ ভজে যোগায় অন্ন নিত্য যাহা পায়\

কন্যাবিয়া কেমনে হবে পড়ল বিষম দায়
আইল অভাব তেরোশত পঞ্চাশ বাংলায়\

ন’বছরে কন্যা বিয়া; বিধান খণ্ডন না যায়
অধিক বয়সে অপয়া হয় বান্দিতে বিকায়\

ব্রাহ্মণ কন্যা মায়ারাণীর বয়স গৈয়া যায়
ভাটির দেশে স্বগোত্রে তার বর নাহি পায়\

মায়ারাণীর বয়স লিখা সমাজের খাতায়
দেখিতে দেখিতে বয়স নয় গৈয়া যায়\

ভিন্ন গোত্রে হইবে বিয়া বান্দি হইয়া হায়
পান্নুয়া বিয়া হইবে তার অপয়ারও দায়\

রূপ-যৌবনে ভরা দেহ বস্ত্রে না কুলায়
বহুবিয়ের বর পাইবে কান্দে তাহার মা’য়\

সেকালে সমাজ-বিধান অনুযায়ী বিবাহের মেয়াদ উত্তীর্ণ মেয়েরা পিত্রালয় ছেড়ে ‘পান্নুয়া’ বা ‘পডক্যিয়া’ বিয়ের সুবাদে বান্দিগোত্রে নাম লিখে বাঁচার অধিকার পেত। নয়-এ নববধূ না হলে মেয়েরা পিতৃকুল হারায়;—এই ছিল রীতি। মেয়েরা পিত্রালয়ে ঋতুবতী হলে মহাপাপ। ব্রাহ্মণ সমাজেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ব্রাহ্মণ সমাজে বরং অপয়াদের মুখ দরশনের অশুভ ভীতি বেশি ছিল। মেয়েরা তাই পিত্রালয়ে ঋতুবতী হলে কুলহারা কলঙ্কিনী গণ্য হয়েছে। আর তাই হয়তো বাউল আব্দুল করিম বিলাপসুরে গেয়ে উঠেছেন : ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী আমারে কেউ ছইও না গো সজনী।’

Ami Kulhara Kolongkini by Baul Shah Abdul Karim; Source: Fokir Hasan Official YTC

ব্রাহ্মণ সমাজেও বিবাহের কঠোরতা ছিল। এ সমাজে পাত্র পাওয়া ছিল দুরূহ বিষয়! আর, তা পেলেও যৌতুকের ‘জায়’ বা ‘ফর্দ’ বেশ দীর্ঘ হতো। কন্যাদান অতএব সহজ ছিল না। মায়ারাণীর বাবা পূজা-পার্বণ করে যা পায় তাতে বাঁচা বিষম দায়। এদিকে তৃতীয় কন্যাও নয় বছরে পা দিলো-দিলো করছে। বছর-বছর কন্যাদানের ভাবনা ব্রাহ্মণকে নির্দয় করে তুলেছিল। পিতৃত্ব এখন আর সন্তানের স্নেহ বুঝে না। অভাবের কারণে সংসারে দেখা দিয়েছে নিষ্ঠুর স্বভাব। এভাবে… বিয়ের দিন চলে যায়! মায়ারাণী দশ বছরে পা দিয়ে অপয়া হয়। তার স্বাভাবিক বিয়ের সুযোগ আর নেই। সমাজ এখন দিন গুণছে তাকে নিলামে নিতে। সমাজপতি দুই-একবার তাগিদ দিয়ে গেছেন পান্নুয়া বিয়ে দিয়ে মেয়েকে বান্দিকুলে পাঠাতে। ব্রাহ্মণী তখন অনুনয়-বিনয় করে মায়ারাণীর জন্ম তারিখ কমিয়ে কিছুদিন মেয়াদ উত্তীর্ণের সময় নিলেও, এখন আর এই সুযোগটিও নেই :

সমাজপতি ক্রোধে অতি ব্রাহ্মণেরে কইল
উদয়-অস্ত সময় আছে অপয়া সে হইল\

উদয়-অস্ত সময় গেল বর নাহি পাইল
অপয়া দুষেতে ব্রহ্মণকন্যা গৃহহারা হইল\

কন্যা লইয়া ব্রাহ্মণ পিতা পন্থে মেলা দিল
কান্দে মায়ে কান্দে বইনে বিধি একি হইল\

আগে ব্রাহ্মণ পিছে কন্যা হাটে যে চলিল
মায়ারাণীর মায়ার কান্দন মনেতে রইল\

এইনা দেখে পথের লোকে গালমন্দ দিল
মাথা নুইয়ে বান্দি হাটে চলিতে লাগিল\

কালীগঞ্জ নামেতে হাট ভাটির দেশে ছিল
কন্যা লয়ে দুঃখ সয়ে হাটে পৌঁছে গেল\

বান্দি-নেবে, বান্দি-নেবে ব্রাহ্মণে ডাকিল
অপয়া নারী ক্রেতাগণে যাচাই করে নিল\

গঠন-গাঠন দেখিয়া তার দরদাম করিল
এমন পণ্য কেউ চিনল না চৌধুরী চিনিল\

বিধির লিখা যায় না দেখা কপালে কী ছিল
একটাকা মূল্য ধইরা চৌধুরী
কিনিল\

দাসী-বান্দি বিক্রয়ের প্রচলন প্রাচীন যুগ থেকে ছিল। মায়ারাণীর বিষয়টি ভিন্ন। দারিদ্র্য কিংবা সহায়-সম্পত্তির লোভে নয়, নিতান্ত সমাজ-বিধানে নিরুপায় হয়ে কন্যা বিক্রয় করতে বাধ্য হয় ব্রাহ্মণ। তিনআনা যৌতুকের দায়ে ষোলআনা মেয়েটি অপয়া হয়। হাটের পণ্য হয়। সেকালে মায়ার বাঁধনের চেয়ে সমাজের শাসন মেনে নেওয়া ধর্ম গণ্য ছিল। বান্দিহাটে মায়ারাণীকে কতজন-যে কতভাবে দরদাম করলো তা ভদ্রভাষায় বলা মুশকিল :

কেউ দেখলো কামের শরীর
কেউ দেখলো রূপের,
কেউ দেখলো মূল্য কত
কেউ দেখলো জাতের।

সুশ্রী মায়ারাণীর দরদামের ফাঁকে কতজন-যে গা ঘেঁষে দাঁড়ালো তার ইয়ত্তা নেই। ব্লাউজ ছাড়া টগবগে বুকের কাপড় সামলাতে গিয়ে যখন তার পিঠ উদোম হয়ে যেত, তখন নিতম্বের ভাঁজে ক্রেতাগণ হাবুডুবু খেত। ভাগ্যিস ক্রেতাদের কেউ মায়ারাণীর চাঁদমুখের হাসি দেখে নাই। তাহলে হয়তো হাটে মল্লযুদ্ধের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে বান্দিজয়ের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতেও পারত।

সেদিন ব্রাহ্মণ তার ব্রাহ্মণ্যত্ব রক্ষার জন্য সন্তান বিক্রয়ের পৈশাচিকতা মেনে নেওয়া সত্ত্বেও ক্রেতার সঙ্গে দর কষাকষি করতে পারল না। লাখ টাকার ‘মাল’ বিক্রি হলো মাত্র এক টাকায়। দাসখতের বিক্রয় দলিলে ব্রাহ্মণ ভুল ঠিকানা দিল ঈজ্জতের ভয়ে। মায়ারাণী এরপর থেকে ভুল ঠিকানায় বাবার ইজ্জত আড়াল করে বান্দি হয়।

মায়ারাণী এথন চৌধুরী বাড়ির উপাধী সূত্রে আচার্য থেকে তালুকদার হয়েছে। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার জন্ম-ঠিকানা জানতে পারিনি, যদিও আন্দাজ করতে পেরেছিলাম পরে। তার পিতৃনিবাস এদিক থেকে অজানা। দক্ষিণ ভাটির বেতাল পরগনা হলো তার দাসী হয়ে ওঠার দলিলিক জন্মভূমি। আর, দরিদ্র ব্রাহ্মণ তার পিতা ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিষয়টি যদিও প্রকাশিত নয়। মায়ারাণীর ভাষ্যমতে দলিলে শুধু এতটুকু উল্লেখ ছিল-যে :

দাসীর নাম : মায়ারাণী।
দাসীর বয়স : ১০ বছর ২ মাস।
বিক্রয়ের কারণ : অপয়া।
বিক্রয়ের ধরণ : নিদাবী।
বিক্রেতা : পিতৃকুলের (ব্রাহ্মণের) ভুল নাম।
টিপসই : বিক্রেতা।
ক্রেতা : বান্দিকুলের (চৌধুরী বাবুর) নাম ঠিকানা।
টিপসই : ক্রেতা।

দলিলাদি শেষে দান-দক্ষিণা আর ঠোঙার ভোজ্জিতে বেঁচে থাকা ব্রাহ্মণ মেয়ে বিক্রয়ের এক টাকা পেয়ে বিত্তশালী হলেও চিত্ত তার অনলে জ্বলছে।ব্রাহ্মণ চৌধুরী বাবুকে হাতে ধরে শুধু একটি কথাই বলেছে : ‘বাবু মেয়েটা আমার ব্রতচারী, অধর্ম কুকর্ম সইতে পারে না।’ চৌধুরী বাবুর কানে এসব কথা বাজারের হট্টগোলের মতোই শোনালো। ব্রাহ্মণের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে মায়ারাণীকে নিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলেন। এদিকে পিতার মনোকষ্টের কথা চিন্তা করে লোকলজ্জার ভয়ে মায়ারাণী বিদায়বেলা চোখের জল ফেলে কাঁদতে পারল না। কিন্তু ব্রাহ্মণ টাকা পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল :

টাকা পাইয়া কান্দে ব্রাহ্মণ কষ্ট যায় না
মায়ারাণীর বিয়ার যৌতুক ছিল তিন-আনা\

বান্দি হাটে লেনা-দেনা কেউত জানে না
মায়ারাণীর হইল তাই টাবগা (*আনুমানিক) বেচাকিনা\

জোৎস্নামাখা রূপ আঁকা কেউ চিনিল না
নিলামে বিকাইল মাল লাভ হইল না\

ভবের হাটে মায়ারাণীর দাম উঠিল না
বান্দি বলে রাংয়ের দরেই বিকিল সোনা\

বিকাইয়া আদরের সোনা প্রাণে সয় না
কান্দিয়া কয় মা’গো আর দেখা হবে না\

মায়ারাণী কান্দিয়া কয় বাবা করি মানা
মায়ের কাছে বান্দিবার্তা ভুলেও কইও না\

বইনাইনরে বুঝাইয়া কইও বিয়া বারামখানা
সময় হইলে যাইব নাইয়র লইয়া শাড়ি-গয়না\

দাসখত দিলো ব্রাহ্মণ তারপর ষোলআনা
চৌধুরী গৃহ হইল তার জন্মের বান্দিখানা\

Artwork: Bandipuran by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

বান্দি নিয়ে হাট থেকে বাড়ি ফিরছেন চৌধুরী বাবু। পথেপথে কত টিপ্পনি। চৌধুরী বাবুর বান্দি-ঐতিহ্যের অহংকার প্রচার হচ্ছে পথ চলতে চলতে লোকের কানে কানে। সন্ধ্যায় বাড়ি পৌঁছা মাত্র লোকজনের ভিড়। বাড়ির বউ-ঝি, পরিবার-পরিজন কত রংয়েন কথকতা বলে গেল। পাড়ার লোকজনও আসলো এ-রঙ্গ দেখতে। কেউ কেউ লোলুপ দৃষ্টিতে বান্দিদেহে কামবিলাসে মত্ত হলো। মায়ারাণীর অসহায় চোখ, বাকরূদ্ধ অধর, হৃৎপিণ্ডে বেদনার দম, আর লজ্জাবতী মুখ দেখে বাড়ির কারও মনে মায়ার দাগ কাটলো না। রাতেই সংসারের নানা কামকাজ সমজিয়ে দিয়ে তাকে আলাদা বান্দিঘরে থাকতে দেওয়া হলো। নিঃসঙ্গ রাতে মা-বাবা ভাই-বোনের কথা ভাবতে ভাবতে কচলে ওঠলো মায়ারাণীর বুক। তারপর রাত পোহালে শুরু হয় তার নতুন পরিচয়ের সকাল।

দিনগুলি কেটে যায় তার নানা কাজে কিন্তু রাত হলেই যত বিপর্যয়! বাবুদের গতরের ব্যথা সারাতে তেল মালিশ, ঘুম পাড়ানোর শীতল বাতাস আর তামাক সাজিয়ে পানের বাটায় খিলি বানানো তার নিত্য দিনের কাজ। তারপর :

ঘুমের ঘরে প্রহরে প্রহরে,
নাগর আসে বান্দিবাসরে।

বিধাতার শরীর কি আর বান্দির ইজ্জত কিংবা সমাজ-নমাজ বোঝে! জরায়ু তো আর স্বামী চিনে সন্তান জন্ম দেয় না, তাই বেইমানিও করে না! ফলে রাতারাতি বান্দির ‘পেট’ জেগে ওঠে অদৃশ্য শিবলিঙ্গের বরে। সমাজে বান্দির পেট নিয়ে শুরু হয় বদনাম ও তালাতালি। মায়ারাণীর পেট যতো বড়ো হয়, তার কামলিপনার দায় ততো বাড়ে। যেখানে চৌধুরী বাড়ির বড়োবাবুর স্ত্রী পাঁচ বছরেও মা হতে পারে না, সেখানে রাত পোহালে বান্দির পেটে বাচ্চা! এ কেমন কথা! কার এত বড়ো সাহস?

বনাজি ঔষধ আর কবিরাজি লতাপাতা খেয়েও যখন পেট অপসারণে কাজের কাজ হয় না, তখন বাবুদের ইজ্জত বাঁচাতে, বান্দিপেটের বৈধতা দিতে মায়ারাণীর জন্য ‘পান্নুয়া’ বিয়ের আয়োজন হয়। ভোগ পরগনার পঁয়ষট্টি বছরের বয়স্ক বরের সাথে ১০০ টাকার যৌতুক চুক্তিতে স্বামীর একান্নতম বধু হয় মায়ারাণী। সেদিন বাসর রাতে মায়ারাণী স্বামীর চরণে সকল কলঙ্ক অঞ্জলি দিয়ে সিঁদুর-কপালি হয়ে কেবল বাচ্চা বিয়ানোর সনদ পেয়েছিল;—বাহুবন্ধনে হৃদয় দেওয়া-নেওয়া নয়। তেরাত্র (তিন রাত) বাস করে বৃদ্ধবর চলে যায় ঠিকানাহীন গন্তব্যে; অন্য বিয়ের সন্ধানে। স্বামী সুখ নয়, মাতৃত্বের দলিল নিয়ে সুখে থাকতে হয় মায়ারাণীকে। আর বাবুরা পান নিরাপদ বিনোদনের বান্দিশরীর।

এ-ধরণের বিয়ের বরকে বলা হয় পান্নুয়াবর, পান্ডাবর, টল্লুয়াবর বা পডক্যিয়াবর। সমাজের ইজ্জত রক্ষায় নিত্যি নিত্যি দায়হীন বিয়ে করা ছিল এদের কাজ। বাবু-মোড়লদের ইজ্জত রক্ষার জন্য তারা অর্থের বিনিময়ে বিয়ে করত। ভাটির ময়ালে এমনও শোনা যায়, নীলমণি দাস নামে এক লোক ছয়কুড়ি বিয়ে করেছিলেন। একদিন এক’শ একুশতম বিয়ে করতে যখন কলার তলে বসেন, তখন কন্যাদানের মন্ত্রপাঠে কন্যার বাবার নাম নীলমণি দাস বলে জানতে পারেন। পরে খোঁজ নিয়ে দেখেন মেয়েটি তার সন্তান। তারপর নীলমণি দাস আর বিয়ে করেননি। অনুতপ্ত হয়ে দেশান্তরী হয়েছিলেন। এটাই ভাটির ময়ালে পান্নুয়া বিয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যা বলে ধারণা করা হয়। তবে মায়ারাণীর স্বামীও ছয়কুড়ি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়।

এদিকে চৌধুরী বাড়ির বড়োবউ (চৌধুরীর বউ) আছেন মুশকিলে। স্বামীসনে রতীকর্মে সারারাত কাউচালি করেও মা হতে পারছেন না তিনি। কিন্তু বান্দির পেট বছর বছর বাচ্চা বিয়ায়! কোন শক্তির বলে? যেখানে ঠাকুরঘর, তুলসীতলা আর পুজামণ্ডপে জোরপাটা মানত করেও কাজ হচ্ছে না তার। কেউ কেউ বলছে বড়োবউয়ের ‘বাচ্চা’ বান্দির পেটে ‘চালান’ হয়ে যাচ্ছে, তাই বান্দি বিদায় না করলে কাজের কাজ হবে না। অসহায় মায়ারাণীর পেট নিয়ে শুরু হয় সমাজে নানা কথা। বড়োবউয়ের পক্ষ থেকে মায়ারাণীকে নিষেধ করা হয় বাচ্চা বিয়ানোয়। বান্দিঘরে পাহারা বসানো হয়। তবু যখন কাজ হয় না, একের-পর-এক চাঁদমুখের জন্ম হয় বান্দিপেটে। সিদ্ধান্ত হয় বান্দি বিদায়ের। কিন্তু চাইলেই কি আর বান্দি বিদায় সম্ভব? পুত্র ত্যাগ করার বিধান আছে সমাজে, কিন্তু বান্দি বিদায়ের বিধান নেই। শত জ্বালা সয়ে সয়ে মায়ারাণী বড়োবউয়ের চক্ষুশূল হয়ে চৌধুরী বাড়িতে পড়ে থাকে :

Book written by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

মুনিবগৃহে মায়ারাণী জ্বালা লইয়া বুকে
সেবা ছলে বুকে তুলে পানান দেয় লোকে\

পানান দিয়া দেয় গো বিয়া পাণ্ডাবর দেখে
দোষ ছাড়ানি পান্নুয়াবিয়া জানে সর্বলোকে\

যোগেন্দ্র নাগ নামেতে বর বাড়ি নাই ভূলোকে
ভাবে-সাবে নয়াযৌবন দাঁত নাই তার মুখে\

নিত্যি করে বান্দি বিয়া টাকা লইয়া শখে
মায়ারাণীর হইল বিয়া পান্নুয়া দলিল লিখে\

মাতৃত্বের অধিকার পাইল অপয়া দোষ থেকে
বছর গিয়া হইল পুত্র পিতায় নাহি দেখে\

একে একে দুইপুত্র হয় একইকুলে থাকে
বাপের আদর পায় না পুত্র গালমন্দ দেয় লোকে\

বড়োপুত্র নামে ‘লেন্দর’ গাঁয়ের লোকে রাখে
বান্দিকুলে জন্ম তাই পশুর নামে ডাকে\

বান্দির পুত্র নাই গোত্রবংশ নাহি লিখে
অনাদর অবহেলায় দাসত্ব তাই শিখে\

দাস-দাসী হইল বেশি নিলো অন্য লোকে
পুত্রহারা হইয়া মায়ে কান্দে পুত্র শোকে\

রূপ-যৌবনে ভাটা দেহ মূল্য নাই মুল্লুকে
বৈদেশে মইরাছে পতি বলছে গাঁয়ের লোকে\

মায়ারাণী বিধবা হয় পতির মুখ না দেখে
দীনবন্ধু দায় ঠেকিয়া বান্দিপুরাণ লিখে\

দাসী-বান্দিদের সাথে গৃহস্বামীর যৌনসম্পর্কের বিষয়টি তৎকালীন সমাজে অন্দর মহলের বিলাসিতা বলে মনে করা হতো। মায়ারাণী সেই বিলাসিতার নিরাপদ পণ্য ছিল। কেননা সে ছিল বিবাহিত। সন্তান জন্মদানের অধিকার সমাজ তাকে দিয়েছে। মায়ারাণীর রূপযৌবন যখন ভাটা পরে যায়, ঠিক তখন তার স্বামী বেঁচে থাকার প্রশ্ন ওঠে! সতীর আগে পতি মরে না। বান্দি সতী হতে পারে না। সধবা হিসেবে বেঁচে থাকার বা সতীত্বের অহংকার তার কেড়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন স্বামীর অনুপস্থিতিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় বিধান মতে। মায়ারাণী হয় বিধবা।

সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা থাকাকালে বিধবা বা স্বামীর প্রশ্নে সমাজ যদিও টু শব্দও করেনি। ভাগ্যিস বিধবা মায়ারাণী শুধু দুই ছেলের মা। মেয়েসন্তান হলে হয়তো বাড়িতে আরও ‘পান্ডাবর’ আসত। বিশেষ করে বান্দিদের গর্ভে মেয়ে সন্তান হলে তাদেরকে পরবর্তীতে মুনিবদের কন্যাদানের সাথে শশুরালয়ে গৃহদাসী হিসাবে দান করা হতো। যা ছিল ভাটি-ময়ালের পারিবারিক ঐতিহ্যের বিষয়। এভাবেই বান্দিকুল ছড়িয়ে পড়ে পরিবার থেকে পরিবারে। অনেক সময় ছেলেদেরকেও গৃহস্থালীর প্রয়োজনে আত্মীয়বাড়িতে প্রেরণ করা হতো। কখনও কখনও বান্দিপুত্রের সাথে মুনিবের মেয়ের অবৈধ সম্পর্কের সুবাদে তারা সমাজচুত্য হয়ে সংসার করত।

কখনও-সখনও গৃহবান্দিগণ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে গিয়ে অচেনা ময়ালে নতুন জীবন শুরু করে। মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিজের মতো করে নিজগৃহে গড়ে তোলে বালাখানা। লোকালয় বা লোককাহিনীতে বালাখানা হচ্ছে গোপন প্রমোদঘর। বাংলায় জমিদার আমলে উচ্চবিত্তরা অনেকসময় উপপত্নী বা বাইজি রাখতেন গোপন ঘরে। এই ঘরগুলো ছিল উচ্চবিত্তদের নিয়ন্ত্রিত বালাখানা। যেখানে বাইজি বা বান্দিদের মুনিবের ইচ্ছায় ব্যবহার করা হতো।

বান্দি-বাইজি যখন নিজের মতো করে বালাখানা গড়ে তোলে, তখন সে দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়। বিশেষ করে ভাটির হাট-বাজার কেন্দ্রিক একসময় গোপনে গোপনে এসব বালাখানায় অর্থের বিনিময়ে রমরমা দেহব্যবসার কদর লাভ করে। গাঁয়ের ধনাঢ্য বাবু-মোড়লগণ হাটের চলে পালাক্রমে বালাখানায় গিয়ে যৌনবিনোদনে মত্ত হয়। বালাখানায় বাইজি বিলাস তখন উচ্চবিত্তদের জন্য আত্মমর্যাদাপূর্ণ বিনোদন ছিল। বালাখানায় গান ও নৃত্যের আসর জমিয়ে খদ্দের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা ছিল। যৌনতার পাশাপাশি মদ্যপান ও পান-তামাকের আয়েশি নেশায় অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে। ভাটি ময়ালের এসব বালাখানায় বাইজির আঙুলের মুদ্রায় বাবু-মোড়লগণ পরিচালিত হতো। বিবাহিত পুরুষরা সাধারণত বালাখানায় বা গৃহবান্দিতে আসক্ত বেশি ছিল।

Artwork: Bandipuran by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

একসময় ভাটির ময়ালে বিবাহিত মুনিবগণ পাণ্ডাবরের অভাবে গৃহবান্দির গর্ভাবস্থা সামাল দিতে না পেরে নিজে বিয়ে করতে বাধ্য হন। এক্ষেত্রে মুনিবদের সাথে বান্দিদের ‘আট্টুয়া’ বা ‘হাট্টুয়া’ বিয়ার প্রচলন হয়। অর্থাৎ বরের (মুনিবের) হাটুতে মুকুট দিয়ে তাতে মাল্য প্রদান করে বিবাহ সম্পন্ন হয়। কেননা বান্দিকুল হিসেবে মুনিবকুলের মস্তকে মাল্যদান হলে তা মুনিবের অমর্যাদা হয়, তাই এ-প্রথা। বান্দিস্ত্রী সম্পত্তির অধিকার পেলেও সমাজ তা ভিন্ন নজরে দেখে। সন্তানদের বান্দিতরফের সন্তান বলে অবিহিত করা হয়। বর্তমানে ভাটি ময়ালে চৌধুরী বা তালুকদার জাতক বান্দি তরফের অনেক সন্তান জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি চাকুরিতে উচ্চপদে কর্মরত আছেন। যা সমাজ সভ্যতায় দাসত্ব থেকে মুক্তির বহিঃপ্রকাশ।

চৌধুরী বাড়ির মায়ারাণীও এখন আলাদা বাড়িতে নিজগৃহে থাকেন সন্তান লয়ে। তাকে কিছু সম্পত্তিসহ বাড়ি তৈরির ভিটার অধিকার দিয়ে চৌধুরী বাবু বাড়ি ছেড়েছেন।বাড়ির লতাগোষ্টীসহ গাঁয়ের সকলে মায়ারাণীর সাথে সমাজ-নমাজ করে দিন কাটাচ্ছেন। একপর্যায়ে মায়ারাণী দুই পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনি রেখে স্বর্গবাসী হয়েছেন। মহা ধুমধামে দান-দক্ষিণা করে মায়ারাণীর শ্রাদ্ধক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তার ছেলেরা এখন সমাজপতি। চৌধুরী বাড়ির মানুষ।

দিশা : শোন শোন বান্দিপুরাণ দুঃখেরও বয়ান
শুনিলে কান্দিয়া উঠে জমিন-আসমান\

. . .

লেখক পরিচয় : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 30

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *