সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশরা যদি পরপর পাঁচটা লেখেন, তার চারটা দায় পূরণের খাতিরে তাঁদেরকে লিখতে হয়েছে, একটা-যে এর মধ্য দিয়েও বেরিয়ে আসেনি তা কিন্তু নয়। কমলকুমারের সঙ্গে পার্থক্য,—তিনি এই চাপ বুঝেশুনেই ঘাড়ে নেননি। মর্জিমতো লিখছেন। ছাপানো দরকার মনে হলে ছোটকাগজে ছেড়ে দিয়েছেন। লেখনক্রিয়াকে এভাবে উপভোগ করছেন কমলকুমার। সুনীলরা ওই কাজটা বড়ো পাঠকবৃত্তের খোরাক মিটাতে লাগাতার লেখা সরবরাহ করার মধ্য দিয়া সারছিলেন। প্রেক্ষাপট সুতরাং ভিন্ন। বৃত্ত ভিন্ন। এবং, এ-কারণে পাঠকের ‘মনোরঞ্জনের’ জন্য একটি অক্ষর কমলকুমার মজুমদার লেখেননি টাইপের কথাবার্তা এক্সপাঞ্জ করা উচিত।
-
-
কুমার চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলেছেন। ভাববার মতো প্রশ্ন, তবে এর মধ্যে উঁকি দিচ্ছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পুরোনো বিরোধ;—যেখানে এরা আজো একজন আরেকজনকে বোঝা ও বিনিময়ের জায়গায় সবল দাঁড়িয়ে নেই। পাশ্চাত্য এখনো মোটাদাগে প্রাচ্যকে রোমান্টিসাইজ করে। নয়তো প্রাচ্যের ভাষা ও বয়নরীতির আগামাথা কিছু তারা ধরতে ও বুঝতে পারে না। ট্রাশ ভেবে বাতিলও করে হামেশা! প্রাচ্য আবার অনেকসময় অন্ধের মতো পাশ্চাত্য ন্যারেটিভকে নিজের ভাষায় ধার করতে যেয়ে অনুকরণে নিঃস্ব হয়। এটি সমস্যা। এবং এখানে এসে আমরা দেখি, দুই গোলার্ধ কমবেশি পুরাতনের পুনরাবৃত্তিতে অনেকটা নিঃস্ব।
-
চেতনার গহিনে জন্ম নিতে থাকা বোধকে কখনো ভাষায় রূপান্তরিত ও প্রকাশ করা যায় না। ভাষা ভুল করে বাস্তবতাকে সেখানে প্রতিস্থাপন করতে যায়। মন এমন এক প্রান্তরে এসে ঠেকেছে, সেখানে কথা আর মুখের সঙ্গী নয়। মুখ দিয়ে যেসব কথার ফুলকি ছুটছে, তার সঙ্গে চেতনার গভীরতলে গুম কথার সংযোগ ভেঙে পড়েছে। যার ফলে প্রকাশিত কথাগুলোকে বাস্তবে ঘটতে থাকা বিরামহীন বিনোদনের যমজ দেখে পাঠক। মানুষ ভুলতে চাইছে এই সত্য যে,—যা সে ভাবে ও বলতে উতলা বোধ করে, একে প্রকাশ করার ভাষা তার করায়ত্ত নয়।
-
গত পনেরো বছর সাহিত্যের ভাষা ও শিল্পকুশলতা কাজে লাগিয়ে সার্কাজমে গমনের সাহস কবিলেখক সমাজে প্রবল হইতে দেখি নাই। উনারা বিস্তর অংবংছং লিখতেছিলেন। তার মধ্যে না ছিল ধার,- না গভীরতা। বিগত ও চলমান সময়কে বিচিত্র মাত্রায় টের পাওয়ার উপায় বাংলাদেশের বিজ্ঞ কবিলেখক বিরচিত সাহিত্যে বড়ো আকারে পাইছি বইলা একিন হয় না। রাডারে ধরা পড়বে এরকম কিছু কি সত্যি তারা পয়দা করতে পারছেন গেণ পনেরা বছর? উনাদের সাহিত্যিক তৎপরতায় না ছিল রস, না মিলতেছে গায়ে জ্বালা ধরানো পরিহাসমাখা হুল,- না পাওয়া যাইতেছে গভীর কোনো সংবেদ। কী মিলতেছে সেকথা ভেবে টাসকি খাইতেছি এখন।